Showing posts with label update bd news. Show all posts
Showing posts with label update bd news. Show all posts

0 দীপু মনি’র বিশ্বরেকর্ড

মিজানুর রহমান: প্রস্তুত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দপ্তরের কর্মকর্তাদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বুকিং ছিল বিমান টিকিট ও হোটেলের। কুয়েত সিটি, জেদ্দা আর রিয়াদে ৬ দিন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর লাগেজ খোলা হয়নি। অপেক্ষায় ছিলেন কখন ডাক আসে সৌদি আরব থেকে। দেশটির একজন মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ বাকি রেখেই জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় ফিরেছিলেন দীপু মনি। কথা ছিল, অ্যাপয়েনমেন্ট হওয়া মাত্রই মন্ত্রী আবার রিয়াদ যাবেন! গত ২৩শে জুন, রোববার। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনের ঘটনা এটি। মধ্যপ্রাচ্যের দু’টি দেশ সফর শেষে বিমানবন্দরে নেমে সরাসরি সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র দপ্তরে যান মন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আগে থেকেই তার দপ্তরে বসা ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বৈঠক সেরে মন্ত্রী তার দাপ্তরিক কাজকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। অধস্তনরা জানান, রাতেই আবার মন্ত্রীকে সৌদি আরব যেতে হতে পারে। সেভাবেই সব প্রস্তুত। সৌদি সরকারের ইনটেরিয়র মিনিস্টারের অ্যাপয়েনমেন্ট পেতে দেরি হওয়া ও ঢাকায় সংসদ অধিবেশন সহ অন্য কর্মসূচিতে যোগদানের বাধ্যবাধকতা থাকায় মন্ত্রী ফিরেছেন। অ্যাপয়েনমেন্ট হলেই তাকে আবার রওনা হতে হবে। রবি ও সোম দু’দিনেও সৌদি মন্ত্রীর অ্যাপয়েনমেন্ট না পাওয়ায় তৃতীয় দিনে (২৫শে জুন) তিনি প্যারিসের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি গত সাড়ে ৪ বছর এভাবেই কাটিয়েছেন। দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শহীদ মিনার উদ্বোধন, পুরস্কার গ্রহণ, সভা-সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কিংবা একান্ত বৈঠক যে কোন দাওয়াতেই ছুটে গেছেন। এ নিয়ে সরকারের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা হলেও স্বামীর বাঁশি শুনতে দিল্লি সফরটি বাতিল করা ছাড়া কখনওই তা গায়ে মাখেননি। শুরু থেকে এ পর্যন্ত একই ভাবে চালিয়েছেন তিনি। গত ৩ মাসে ৫৫ দিন দেশের আকাশ ও স্থল সীমানার বাইরে কাটিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে লন্ডনে ৩ দিন এবং বেলারুশে দেড় দিন ছাড়া বাকি সময় তিনি তার দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়েই ছিলেন। সাম্প্রতিককালে তার সবচেয়ে আলোচিত ছিল আজারবাইজান টু যুক্তরাষ্ট্র ভায়া সুইজারল্যান্ড যাত্রা। ১৩ই জুন নিউ ইয়র্কে ইউনেস্কোর উদ্যোগে সংস্কৃতি মন্ত্রীদের ওই আয়োজনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে একমাত্র তিনিই হাজির ছিলেন। সর্বসাকুল্যে ২০ মিনিটের একটি ফটো সেশনের জন্য বাকু থেকে টার্কিশ এয়ারের ফ্লাইটে সেখানে ছুটে যান তিনি। পড়ন্ত বিকালে জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনে হালকা খাবার গ্রহণ করে সুইস এয়ার যোগে জেনেভার পথে রওনা হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই উড়াল কূটনীতি নিয়ে তার অনুপস্থিতিতে সংসদে তুমুল আলোচনা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঢাকায় নাস্তা, দিল্লিতে লাঞ্চ আর নিউ ইয়র্কে ডিনার করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী অহেতুক বিদেশ সফরে গিয়ে জনগণের অর্থের অপচয় করছেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের বাজেট কর্তনের দাবিও উত্থাপন করা হয়েছে গত বাজেট অধিবেশনে। দীপু মনির দপ্তর, তথ্য অধিকার আইনে প্রদত্ত বিবরণী ও ঘোষিত সফরসূচি মতে, প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে (২০০৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে বিদেশ সফর শুরু করেন) গত ৫৪ মাসে (১০ই জুলাই, ২০১৩ পর্যন্ত) ১৮৭টি সফর করেছেন তিনি। এই সময়ে প্রায় ৬০০ দিন দেশের বাইরে কাটিয়েছেন দীপু মনি। বিদেশ সফরে প্রতিবেশী কোন রাষ্ট্র তো নয়ই, এশিয়া, ইউরোপ আমেরিকার প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদেরও ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। ভারতের সদ্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা কিংবা পাকিস্তানের হিনা রব্বানি খার কেউই বিদেশ সফরে ১০০ পার হতে পারেনি। সদ্য বিদায়ী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন চার বছর মেয়াদে ১১২ দেশ সফরে গিয়ে ৩০৬ দিন বিদেশের মাটিতে কাটিয়েছেন। তার পূর্বসূরিদের অনেকে ২৫-৩০ দিন পর্যন্ত একটানা বিদেশ সফর করলেও কারই ৪০০ দিনের বেশি বিদেশে কাটানোর রেকর্ড নেই। এক মেয়াদে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশ সফর করে সবার রেকর্ড ভেঙেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নয়া রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন মহাজোটের চমক মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য ডা. দীপু মনি!
রহস্যজনক ভ্রমণ বিল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষার্থী শামীন হোসেন তার গবেষণার কাজে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশ সফরকারী দীপু মনির সফরের বিস্তারিত বিবরণ (উদ্দেশ্য ও ব্যয়সহ) চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলেন। গত বছরের শুরুর দিকে তিনি আবেদনটি করেন। বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে মধ্য জুনের দিকে তা হাসিল করতে সমর্থ হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের মাধ্যমে ওই গবেষককে একটি বিবরণী সরবরাহ হলেও সেখানে প্রতিটি ভ্রমণে মন্ত্রীর সঙ্গে ক’জন সফরসঙ্গী ছিলেন, তাদের পেছনে রাষ্ট্রের কত অর্থ ব্যয় হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি। ওই বিবরণীতে শুধুমাত্র মন্ত্রীর (২০০৯-এর জানুয়ারি থেকে ২০১১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত) ৭৫টি প্যকেজ ট্যুর (সিঙ্গেল হিসাবে ১১২টি সফর)-এর হিসাব দেয়া হয়। ওই তিন বছরে বিমান ভাড়া, হোটেলের স্যুইট ভাড়া ও অন্যান্য ভাতা বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মন্ত্রীর একাউন্টে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯৫৯ টাকা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১২’র জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ১০ই জুলাই পর্যন্ত মন্ত্রী আরও ৭৫টি সফর করেছেন। মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগ সূত্রের দাবি, সফরের মোট হিসাব মন্ত্রীর  দপ্তরে সংরক্ষণ করা হয়। বিল-ভাউচার জমা দেয়ার জন্য এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া আছে। নতুন অর্থ বছরের বিলগুলো ছাড়া সমুদয় বিল স্ব স্ব অর্থবছর থেকে সমন্বয় করা হয়েছে জানিয়ে বাজেট বিভাগের ওই কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রী এ পর্যন্ত কত দেশ ভ্রমণ করেছেন, সফরসঙ্গীর মোট সংখ্যা কত, তাদের যাতায়াত, আবাসন, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ইত্যাদিতে রাষ্ট্রের কত অর্থ ব্যয় হয়েছে তার খাতওয়ারি তথ্য চেয়ে একজন গবেষক আবেদন করেছেন। এর একটি হিসাব বিবরণী তৈরি হচ্ছে। বাজেট বিভাগের ওই কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক কোন হিসাব দিতে পারেননি। তবে তিনি গত মাসে মন্ত্রীর আলোচিত আজারবাইজান টু যুক্তরাষ্ট্র ভায়া জেনেভা ট্যুরের বিলের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ত্রিদেশীয় এ ট্যুরে মন্ত্রীর সফরসঙ্গীরা প্রত্যেকে প্রায় ৫ লাখ টাকা করে বিল দেখিয়েছেন। চারজন সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য ইকোনমি ক্লাস ও হোটেলের সাধারণ রুম ছিল। কর্মকর্তা কিংবা অন্য সফরসঙ্গীদের চেয়ে মন্ত্রী কয়েক গুণ বেশি সুবিধা পান। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমানের ফার্স্ট ক্লাসে ভ্রমণ (না পেলে বিজনেস ক্লাস) ও হোটেলে মডারেট স্যুইট (প্রতি রাতের জন্য ২৯৫-৪২০ ডলার) ছাড়াও নগদ ভাতা, হাতখরচ, ট্রানজিট ভাতা, টার্মিনাল ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, প্রতিনিধি দলের দলনেতা হিসেবে আনুষঙ্গিক ভাতা, বিমানবন্দর কর বরাদ্দ দেয়া হয়। ত্রিদেশীয় এ ট্যুরে মন্ত্রীর তরফে প্রায় ১৬ লাখ টাকা বিল করা হয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এমন বিল প্রতি মাসে দু’তিনটি হয়। কাছাকাছি দেশে ভ্রমণের বিল তুলানামূলক কম হয় জানিয়ে তিনি বলেন, মন্ত্রীর একেকটি প্যাকেজ ট্যুরে (সফরসঙ্গীসহ) ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিল হয়। এসব বিল মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছে পুরোপুরি রহস্য। পছন্দের এক ট্রাভেল এজেন্সি থেকে সব সময় মন্ত্রী ও তার সফর সংশ্লিষ্টদের টিকিট কেনা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে লাক্সারি বিমান এমিরেটস তার প্রথম পছন্দ। দীর্ঘ দিন এমিরেটসের রিজারভেশনে কাজ করেছেন এমন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সরকারি বিধি মতে মন্ত্রী বা পদমর্যাদার ব্যক্তিদের যেভাবে টিকিট করা হয় সেখানে একবার লন্ডন যেতে (ঢাকা থেকে বিজনেস ক্লাস, দুবাই থেকে হিথ্রো ফার্স্ট ক্লাস) ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা ভাড়া গুনতে হয়। রুট ভেদে ফার্স্ট ক্লাস প্রিমিয়াম স্যুটের ভাড়া ৮-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয় বলেও জানান এমিরেটস এর ওই কর্মকর্তা। এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হোটেল স্যুইটের ভাড়া মওসুম ভেদে কমবেশি হলেও তার কোন ছাপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা তার সফরসঙ্গীদের ভ্রমণ বিলে পাওয়া যায় না বলে দাবি করেন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা। তথ্য অধিকার আইনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম ৩ বছরের ভ্রমণের যে হিসাব প্রকাশ করেছেন সে প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন এমন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, তা একান্ত তার নিজস্ব খরচ। তার বহরে থাকা দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের কর্মকর্তা, নির্বাচনী এলাকার লোক ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের বিল সমপূর্ণ আলাদা। সব বিল এক সঙ্গে করলে তা ৪০ কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। ক্ষমতা ছাড়া পর্যন্ত এই অবস্থা  অব্যাহত থাকলে তা ৫০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা দেন তিনি।
শেষ সময়ে সফর-ব্যয় বেড়েছে: দায়িত্ব গ্রহণের ২২ দিন পর থেকে বিদেশ সফর শুরু করেন দীপু মনি। প্রথম যান জেনেভায়। ২০০৯ সালে ৩৪ বার সফরে বের হন তিনি। পরের দুই বছরে এ সংখ্যা আরও বাড়ে। তৃতীয় বছরে তা ৪৪-এ গিয়ে দাঁড়ায়। চতুর্থ বছরে ৪৬। আর চলতি বছরে এ পর্যন্ত ২৯টি সফর সেরে ফেলেছেন। এখনও প্রায় তিন মাস সময় তার হাতে আছে। আগামী ২৫শে জুলাই প্রাইভেট ভিজিটে ৩ দিনের জন্য দিল্লি যাচ্ছেন তিনি। এটি তার ১৮৮তম সফর। সফরটির বিষয়ে মন্ত্রীর পিআরও মনিরুল ইসলাম কবিরের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ঘোষিত সিডিউল মতে, দিল্লি থেকে ফেরার পর তার সৌদি আরব, চীন, ইউক্রেন, মিয়ানমার (ভিভিআইপি), কোস্টারিকা, জাতিসংঘের ৬৮তম অধিবেশন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত সফরের কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগে কর্মকর্তাদের মতে, শেষ সময়ে সফর সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি ব্যয়ও বাড়ছে।
দ্বিপক্ষীয় সফর হাতেগোনা: বিগত সাড়ে চার বছরে মাত্র ১৭টি দ্বিপক্ষীয় সফরে গেছেন দীপু মনি। সর্বশেষ জুনের তৃতীয় সপ্তাহে দ্বিপক্ষীয় সফর করেছেন কুয়েত ও সৌদি আরবে। অবশ্য পশ্চিম ও মধ্যপ্রাচ্য অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, আজারবাইজানে একটি সম্মেলনে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে মন্ত্রীর সফরটি হলেও সেখানে দ্বিপক্ষীয় উপাদান ছিল। এর আগে গত ৪ঠা জুন রিয়াদ সফরটিও দ্বিপক্ষীয় ছিল বলে দাবি তাদের। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্য এক কর্মকর্তা জানান, প্রতি বছর অনেক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ আসে। যেগুলোতে মন্ত্রীপর্যায়ের অংশগ্রহণ তেমন জরুরি নয়। কিন্তু মন্ত্রী কারও পরামর্শ না নিয়েই তাতে যোগ দেন। এতে অনেক ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, কোথায় মন্ত্রীর যাওয়া উচিত আর কোথায় অনুচিত তা পররাষ্ট্র সচিব ও সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকদের ঠিক করার রেওয়াজ। কিন্তু দীপু মনি তা একেবারেই মানেন না। তিনি নিজের সিদ্ধান্ত বরাবরই নিজে নেন। বিগত দিনে যে অনুষ্ঠানে যেতে চেয়েছেন তা চূড়ান্ত করে অধস্তনদের জানিয়ে দিয়েছেন। আর যেখানে যেতে চাননি তার জন্য পরামর্শ করে অন্য কাউকে পাঠিয়েছেন কিংবা বাদ দিয়েছেন।    
ফাইলও বিদেশ ঘুরে, সিদ্ধান্ত পেতে রজনী পার: বিদেশ সফরে ব্যস্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফাইল দেখার সময় নেই। বিমানবন্দর থেকে বাসায় অফিস কিংবা বাসায় আস-যাওয়ার সময়টুকু বরাবরই কাজে লাগান কর্মকর্তারা। রেওয়াজ মতে, পররাষ্ট্র সচিব ও দেশে থাকা মন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তাদের তার আগমন ও প্রস্থানকালে বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর  কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত সারসংক্ষেপ কিংবা নিয়োগ-বদলি, পদায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো আগে থেকে পররাষ্ট্র সচিবের স্বাক্ষর নিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়। যাতায়াত পথে, বাসায় কিংবা বিমানবন্দরে তাতে সই নেয়া নয়। ঘনিষ্ঠরা জানান, কোন কারণে দেশে ফাইল দেখা সম্ভব না হলে মন্ত্রী তা সঙ্গে নিয়ে যান। সে ক্ষেত্রে তার ফেরত আসা পর্যন্ত ফাইল বিমানে বিমানে ঘোরে। এদিকে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহাপরিচালকরা তাকে বিভিন্ন কাজে সরাসরি মেইল করে সিদ্ধান্ত চান। এ ক্ষেত্রেও ভোগান্তি পেতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে মন্ত্রী মেইলেই সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য মন্ত্রীর বিমান থেকে নেমে হোটেলে পৌঁছা এবং ফ্রেশ হয়ে মেইল চেক করা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়। সময়ের ব্যবধান থাকায় বেশির ভাগ সময় মধ্যরাতে জবাব মেলে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত শেষ রাত কিংবা রজনী পার হয়ে যায় বলেও জানান এক কর্মকর্তা।
অর্জনের ঝুলি শূন্য: সরকারের সাড়ে চার বছরে ২০ বার লন্ডন সফর করেছেন দীপু মনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ‘সুনির্দিষ্ট’ কোন কর্মসূচি ছিল না সেখানে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে গেছেন দু’বার। বাকি সময় প্রইিভেট ভিজিট। তবে সবচেয়ে বেশি সময় গেছেন তার সন্তানকে সঙ্গ দিতে। অবশ্য তার দপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তার (বর্তমানে বিদেশ মিশনে পোস্টিংয়ে) দাবি, যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে মরিয়া জামায়াত-শিবিরের যুক্তরাজ্য ভিত্তিক প্রচারণা ঠেকাতে তিনি বার বার লন্ডন সফর করেছেন। মন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাওয়া নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, হাতেগোনা ক’টা দ্বিপক্ষীয় সফর করেছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে গেছেন ৪৪টি ভিভিআইপি সফরে। এর মধ্যে চলতি বছরে প্রধামন্ত্রীর সঙ্গে রাশিয়া, থাইল্যান্ড, লন্ডন ও সর্বশেষ পূর্ব ইউরোপের দেশ বেলারুশ। সদ্যপ্রয়াত প্রেসিডেন্ট গত আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন দফা চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর ও লন্ডনে গেছেন। বেশ ক’দিন বিদেশের মাটিতে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও কোথাও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখা যায়নি। এই দিনগুলোতেও তার সফর থেমে ছিল না। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ১৬বার যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন দীপু মনি। ওবামা প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। সিনেট কংগ্রেসম্যানদের সঙ্গে বৈঠকেও গেছেন তিনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এক চুলও এগোয়নি বরং নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক সরকারের রোষানলে থাকায় বরাবরই ক্ষুব্ধ যুক্তরাষ্ট্র। হিলারি ঢাকায় এসেও উদ্বেগ জানিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের শ্রমমান ও শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ ছিল এবং আছে। বিষয়গুলো নিয়ে বার বার সতর্কতা ও নোটিশ করার পর সমপ্রতি দেশটির বাজারে বাংলাদেশী পণ্য প্রবেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে ওবামা প্রশাসন। এবার ইউরোপের বাজার নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও দীপু মনির সমপ্রতি জেনেভা সফরে ইইউ’র তরফে শর্ত জুড়ে দিয়ে শ্রমমান উন্নয়নে বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা এসেছে। কেবল এই ইস্যু নয়, এর আগেও ১১ বার সুইজারল্যান্ড, ৪ বার জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সিরিজ সফর করেছেন দীপু মনি। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাই প্রোফাইল সফর বিনিময় ছাড়াও কমপেক্ষে ৯ বার এককভাবে ভারত সফরে গেছেন দীপু মনি। বাংলাদেশের বড় উদ্বেগ সীমান্ত হত্যা আজও বন্ধ হয়নি। দেশটির সঙ্গে সম্পাদিত সীমান্ত চুক্তি ও প্রটোকলের বাস্তবায়ন তো দূরে থাক লোকসভার অনুমোদনও আজ পর্যন্ত মিলেনি। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে ভারতের তরফে কোন সাড়া না পেলেও বরাবরই দীপু মানি দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা সম্পাদনের বিষয়ে আশাবাদী। সব প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার পর আগামী সপ্তাহে ‘ইনফরমাল ডিপ্লোমেসি’ করতে তিনি নয়া দিল্লি যাচ্ছেন। শোনা গেছে, প্রাইভেট ভিজিট হলেও তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েছেন। বিশ্বের খুব কম দেশই বাদ গেছে দীপু মনির সফর তালিকা থেকে। ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক মিয়ানমার, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, মিশর, চীন, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, পর্তুগাল, ভুটান, ইতালি, জাপান, ইরান, কাজাখস্তান, নেদারল্যান্ডস, ভিয়েতনাম, নরওয়ে, কোবা, সাউথ আফ্রিকা, সিরিয়া, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো ডেনমার্ক, মরিশাস, ফিলিপাইন, নেপাল, তাজিকিস্তান, জিবুতি, ব্রাজিল, উগান্ডা, বেলজিয়াম, স্পেন, কানাডা, লিথুয়ানিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ওমান, তুর্কমেনিস্তান, ব্রুনাই দারুস সালাম, লাটভিয়া- কোথায় যাননি তিনি। ন্যূনতম একবার ঊর্ধ্বে ৪-৫ বার পর্যন্ত গেছেন একেকটি দেশে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তিনি রীতিমতো চষে বেড়িয়েছেন। মিশন কর্মকর্তারা তার খেদমতে অর্থকড়ি ও সময় ব্যয় করেছেন। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানি কিংবা কাঠামোগত সংস্কার বা অর্জন- কাজের কাজ কিছুই হয়নি। জনশক্তি রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি তো নয়ই, পুরনো বাজারও হাতছাড়া হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সৌদি আরবে আকামা পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে দেশটির সরকার। তবে ভিসার জন্য কবে উন্মুক্ত হবে তা কেউই জানে না। এত সফরের পরও অর্জনের ঝুলি শূন্য থাকার অভিযোগ মানতে নারাজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরা। তাদের মতে, দীপু মনি পথ দেখিয়েছেন। তার দেখানো পথ ধরেই সফলতা আসবে। সেই পর্যন্ত দেশবাসীকে অপেক্ষায় থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।    
সংসদ না ভাঙলে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে: চলতি বছরেই দীপু মনির বিদেশ সফরের ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা মতে, আগামী ২৪শে অক্টোবর সংসদ ভেঙে দেয়া হবে। ওই দিন মন্ত্রীরাও পদত্যাগ করবেন। যদি তা না হয় তাহলে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বিদেশ সফরের ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ হবে ১১ই নভেম্বর। খসড়া সিডিউল মতে, ২০০তম সফরে ওই দিন এশিয়া-ইউরোপ মিটিং (আসেম)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে তিনি দিল্লি যাবেন। অবশ্য তার আগে আরও এক ডজন সফর করবেন দীপু মনি।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন উত্তর দিতে রাজি হননি।

0 সরেজমিনহামলাকারীদের অতীত কীর্তি

বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত শাকিলের বাবা আনছার আলী লজ্জায়, গ্লানিতে মুখ দেখাতে পারছেন না। এখন ছেলের শাস্তি হলেই শান্তি পাবেন বাবা আনছার আলী। একইভাবে সন্তানের শাস্তি চান ইমদাদের মা জোহরা বেগম। 'ইমদাদ যে মায়ের বুক খালি কইরেছে, তার জন্যি কষ্ট হচ্ছে,' কালের কণ্ঠকে বলেন জোহরা। মাদ্রাসাশিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য ছেলে মাহফুজুর রহমান নাহিদকে পাঠিয়েছিলেন ঢাকায়। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে ছেলের অংশ নেওয়ার খবরে রীতিমতো শয্যাশায়ী নাহিদের বাবা। এদিকে অভিযুক্ত ইমদাদুল হকের স্বভাব-চরিত্র যে আগে থেকেই ভালো ছিল না, কলেজজীবনে লজিং থাকার সময়ই সে গৃহকর্ত্রীকে নিয়ে পালিয়েছিল, তা জানা যায় তার স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর গ্রামের বাড়ি গিয়ে এসব তথ্য তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। সেসব তথ্য জানিয়েছেন কালের কণ্ঠের স্থানীয় প্রতিনিধিরা।
শাকিল : 'ওই রাতে ওর হাতে অস্ত্র, মাদক আর বেপরোয়া চলাফেরা দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। পরে আর যোগাযোগই রাখিনি', বলছিলেন অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম শাকিলের ছোটবেলার বন্ধু মনিরুল ইসলাম মনির। তিনি জানান, শাকিলের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তাঁর যোগাযোগ হতো। ২০১০ সালের মাঝামাঝি ঢাকায় এক রাতে তিনি শাকিলের সঙ্গে ছিলেন। ওই রাতে শাকিল ৮-১০ জন বন্ধু নিয়ে মাদক সেবন করে। বন্ধুদের সবাই ছিল ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী এবং তাদের মধ্যে ছয়জন ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তবে চাপাচাপির পরও মনির কোনো মাদক সেবন করেননি। মনির জানান, শাকিল পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণী পাসের পর চলে যায় ঢাকা। সেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে ভর্তি হয়।
পটুয়াখালী ফায়ার সার্ভিস রোড এলাকায় শাকিলদের বাড়ি। বাবা আনছার আলী এমএলএসএস পদে কর্মরত ছিলেন পটুয়াখালী আয়কর অফিসে। ২০০৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাখেরগঞ্জ উপজেলার মহেশপুরা গ্রামে। তাঁর দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী শাহিদা বেগমকে নিয়ে পটুয়াখালী থাকেন। শাকিলের বড় ভাই শাহিন পটুয়াখালী পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিলের বাবা আনছার আলী বলেন, 'আমি ওকে (শাকিল) লেখাপড়া করার জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছি, সন্ত্রাসী বা মাস্তানি করতে না। ওর কর্মকাণ্ড টেলিভিশনের পর্দায় দেখে সমাজে এখন আর মুখ দেখাতে পারছি না। আমি চাই ওর উপযুক্ত শাস্তি হোক। এ সন্তান থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো।'
মাহফুজুর রহমান নাহিদ : বাড়ি ভোলার দৌলতখান উপজেলার দক্ষিণ জয়নগর গ্রামে। বাবা মাওলানা আবদুর রহমান স্থানীয় দক্ষিণ জয়নগর হোছাইনিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মাহফুজ ২০০১ সালে দাখিল এবং ২০০৩ সালে আলিম পাস করার পর ঢাকায় চলে যায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিষয়ে অনার্স শেষে বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। গত জুলাই মাসে বরিশালে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে পরীক্ষা দেয় মাহফুজ।
গ্রামের বিভিন্ন সূত্রমতে, আলিমে পড়া অবস্থায়ই সহপাঠীদের সঙ্গে স্থানীয় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় মাহফুজ। কিন্তু বাবা ও বড় ভাইয়ের কঠোর অবস্থানের কারণে সক্রিয় রাজনীতি করা হয়নি তার। ঢাকায় যাওয়ার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় সে।
মাহফুজের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, তার বৃদ্ধ বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাওলানা আবদুর রহমান এ ঘটনা শোনার পর থেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। স্বজন-প্রতিবেশী কারো সঙ্গেই কথা বলছেন না। একই অবস্থা মাহফুজের মা সামসুন নাহারের।
স্বজনরা বলেন, অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক বাবা তাঁর ছেলেকে মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক বানাতে উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। আর সেই ছেলে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করছে- এমন দৃশ্য দেখার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা মাওলানা আবদুর রহমান। মা সামসুন নাহার ছেলের জন্য বিলাপ করতে করতে এখন নির্বাক। এ ঘটনায় হতবাক মাহফুজের সহপাঠী, প্রতিবেশী, স্বজন সবাই।
বড় ভাই মাকসুদুর রহমান জানান, মাহফুজের এই কর্মকাণ্ড দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে তাঁদের পরিবার। ছেলের (মাহফুজের) এমন কাজে স্থবির হয়ে গেছে পুরো পরিবার। কী কারণে মাহফুজ এমন নৃশংস কর্মকাণ্ডে জড়িত হলো, তা জানা নেই পরিবারের কারোই।
ইমদাদুল হক : যশোরের শার্শা উপজেলার পাঁচকায়বা গ্রামের গরিব কৃষক আকরাম আলীর সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে ষষ্ঠ ইমদাদুল। মাঝবয়সী মা জোহরা বেগম সন্তানের নৃশংসতার কথা প্রতিবেশীর কাছে শুনেছেন। গতকাল যশোর শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে ইমদাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা জোহরা মলিন একটি শাড়ি পরে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি বলেন, 'ইমদাদ যে মায়ের বুক খালি কইরেছে, তার জন্যি কষ্ট হচ্ছে। কোন শয়তান ওর ওপর ভর করিছিল, তা আল্লায় জানে। ছাওয়ালডা ঢাকায় যাইয়ে সঙ্গদোষে খারাপ হইয়েছে।' জোহরা আরো বলেন, 'তোমরা যা ভালো মনে করো, তাই করো। ছেলের শাস্তি দিলে দাও।'
ইমদাদের বাবা তিন বছর আগে মারা গেছেন। ইমদাদের ভাই জাকির জানান, 'সে ঢাকায় ছাত্রলীগ করত এবং কোনো একটি হলের ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল বলে আমাদের বলেছে।'
ইমদাদের ভগ্নিপতি নরিম আলী বলেন, কলারোয়া উপজেলার কাজীরহাট কলেজে লেখাপড়া করার সময় এলাকার এক গ্রামে লজিং থাকত ইমদাদ। সে একদিন গৃহকর্তার স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে সালিসে মীমাংসা হয়।
বাইকোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, 'ইমদাদ আমাদের স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। ও নম্র-ভদ্র ছিল। কোনো অভিযোগ শুনিনি তারা বিরুদ্ধে।' এলাকার ইউপি সদস্য নিজামুদ্দিন বলেন, 'ইমদাদ বাড়িতে খুব কম আসত। গ্রামে তার নামে কোনো অভিযোগ শুনিনি।' শার্শা থানার ডিউটি অফিসার এএসআই সোমেন কুমার বিশ্বাস বলেন, 'ইমদাদকে ধরার জন্য তার গ্রামের বাড়িসহ সম্ভাব্য সব স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তার নামে থানায় কোনো অভিযোগ আছে কি না, তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না।'
ওবায়দুল কাদের তাহসীন : বাড়ি নোয়াখালী জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার পৌর এলাকার চরকৈলাশ গ্রামে। পরিবার জামায়াত-শিবিরের সমর্থক। বাবা মাওলানা মো. মহিউদ্দিন স্থানীয় আজহার উলুম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। তিনি একসময় ছাত্রশিবির হাতিয়া উপজেলার সভাপতি ছিলেন। তাঁর দাদা মরহুম মাওলানা রুহুল আমিন হাতিয়া উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ছিলেন। তাহসীনের বড় ভাই সাব্বির আহাম্মেদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং সে ফারুক হত্যা মামলার ২ নাম্বার আসামি।
ছোট ভাই মঞ্জুরুল কাদের আজহার উলুম মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থী। দুই বোনের মধ্যে বড় বোন তাহমিনা আক্তার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সম্মানের ছাত্রী। ছোট বোন তাহমিদা আক্তার (১০) মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে।
গতকাল তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা ফরিদা খানম, ছোট ভাই মঞ্জুর কাদের ও ছোট বোন তাহমিদা বাড়িতে রয়েছে। মঞ্জুর জানায়, তার বড় ভাই সাব্বির শিবিরের সঙ্গে জড়িত, এটা সে জানে। মেজ ভাই তাহসীন জগন্নাথে কোনো দল করে কি না, তা সে জানে না। তাহসিন ২০০৩ সালে হাতিয়ার এএম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ঢাকার কুর্মিটোলা শাহীন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এরপর ভর্তি হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
হাতিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জানান, তাহসীন স্কুলজীবনে এখানে পড়ালেখা করলেও ছাত্রলীগের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। হাতিয়া উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মো. ইদ্রিস জানান, তাহসীনের বাবা মাওলানা মহিউদ্দিন তাঁদের দলের কোনো সক্রিয় কর্মী নন, সমর্থক। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তার আহাম্মেদ জানান, তাহসীনের পুরো পরিবারই জামায়াত শিবির করত। তার বড় ভাই সাব্বির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের নেতা এবং ফারুক হত্যা মামলার ২ নম্বর আসামি। বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর তাহসীনের বাবাকে দেখা যাচ্ছে না।
নূরে আলম লিমন : রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পূর্ব শুলি্লপাড়া গ্রামে বাড়ি। বাবা মীর মো. নূরুল ইসলাম ১২-১৩ বছর আগে জমিজমা বিক্রি করে স্ত্রী নুর বানু ও ছেলে লিমনকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। এর পর থেকে দরিদ্র এ পরিবারটির গ্রামের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই। গ্রামের বাসিন্দা সফর আলী বলেন, 'ঢাকায় যাওয়ার পর নূরুল ইসলামের ছেলে এমন হয়েছে, সেটা জানা ছিল না। এ ঘটনায় তার শাস্তি হওয়া উচিত।' লিমনের চাচাতো ভাই আফছার আলী মীর জানান, গ্রামে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে ঢাকায় যাওয়ার পর এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় লিমন।

0 নির্যাতন থেকে শক্তি সঞ্চয় করে হরতাল পালন করা হবে: খালেদা

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: আশিক/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ঢাকা: বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলমসহ নেতাকর্মীদের নির্যাতন থেকে শক্তি সঞ্চয় করে সোমবার বিক্ষোভ ও মঙ্গলবার হরতাল কর্মসূচি পালন করবে ১৮ দলীয় জোট।

অবরোধ চলাকালে রাজধানীর আমিনবাজার এলাকায় গুলিবিদ্ধ নাজিম উদ্দিনকে স্কয়ার হাসপাতালে দেখতে গিয়ে একথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের ডাকা অবরোধে রোববার বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষে পেটে গুলিবিদ্ধ হন নাজিম উদ্দিন। পরে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিন রাত পৌনে ১১টায় স্কয়ার হাসপাতালে আসেন বিএনপি চেয়ারপার্সন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুস সালাম, নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন।

রাত ১১টা ১০ মিনিটে হাসপাতাল ত্যাগ করেন খালেদা জিয়া।

এসময় খালেদা জিয়ার পক্ষে সাদেক হোসেন খোকা সাংবাদিকদের বলেন, “বিকেল থেকেই নাজিম উদ্দিন আলমের অবস্থা অবনতির হতে থাকে। এ পর্যন্ত তার তিনটি অপারেশন করা হয়েছে। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এই মুহূর্তে উন্নত চিকিসার জন্য তাকে বাইরে নেওয়াও সম্ভব নয়।”

খোকা জানান, “নেত্রী নাজিম উদ্দিনের চিকি‍ৎসার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। পুলিশি নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে নেত্রী বলেন, নাজিম উদ্দিন আলমের নির্যাতনের মাধ্যমে আমরা আরও শক্তি সঞ্চয় করেছি এবং সেই শক্তি নিয়ে বিক্ষোভ ও হরতাল কর্মসূচি পালন করবো।”

রোববারের অবরোধে দেশব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষ, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। এতে নিহত হন তিনজন। এর প্রতিবাদে সোমবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও মঙ্গলবার হরতালের ডাক দিয়েছে ১৮ দল।

খালেদা জিয়া সরকারকে হুশিয়ার করে বলেছেন, “প্রশাসনের সহযোগিতা না থাকলে আওয়ামী লীগের টিকিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

স্কয়ার হাসপাতালে ড্যাব মহাসচিব ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “নাজিম উদ্দিনের ডান পাজরে দুই ইঞ্চি ভেতরে খাদ্যনালী পর্যন্ত গুলি ঢুকেছে। এ পর্যন্ত তার আড়াই লিটারের মতো রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। এখনও দুটি গুলি ভেতরে রয়েছে। তবে তার রক্তচাপ স্বাভাবিক। তাকে কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।”

চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, “২৪ ঘণ্টা না গেলে তার অবস্থা বোঝা যাবে না।”

0 অবরোধে সরকারদলীয় ক্যাডারদের হাতে ২ জনসহ নিহত ৩ : বিরোধী সমর্থক সন্দেহে বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করল ছাত্রলীগ

বিরোধী জোটের ডাকে গতকাল রাজপথ অবরোধ কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় ৩ জন নিহত হয়েছে। বিরোধী সমর্থক সন্দেহে রাজধানীর পুরান ঢাকায় শত শত মানুষের সামনে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বিশ্বজিত দাস নামের এক যুবককে। স্থানীয় দোকান কর্মী বিশ্বজিতকে বিএনপি তাদের কর্মী দাবি করলেও তার সংখ্যালঘু পরিবার জানিয়েছে কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল না। কোনো রকম মিছিল-পিকেটিংয়ে অংশগ্রহণ না করেও কেবল ছাত্রলীগের মিছিলের সামনে পড়ে পথচারী বিশ্বজিতকে প্রাণ দিতে হয়েছে অকালে। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে টেইলরিং কাজ করতেন তিনি।
এছাড়া অবরোধ চলাকালে ছাত্রলীগ ক্যাডারা সিরাজগঞ্জে এক জামায়াত কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এদিকে অবরোধ ভাঙতে রাস্তায় নামানো মিনিবাসের চাপায় এয়ারপোর্টের সামনে নিহত হয় এক যুবক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সকাল ৯টার দিকে ছাত্রলীগ অবরোধবিরোধী মিছিল বের করে। মিছিলটি পার্কের কাছে আসার পরই অবরোধের সমর্থনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের একটি মিছিলের মুখোমুখি হয়। এ সময় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আইনজীবীদের মিছিলকে ধাওয়া করে ছাত্রলীগ ক্যাডররা। কয়েক আইনজীবীকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে তারা। অনেকের পকেট থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নিতেও দেখা যায়। ঠিক এ সময় হামলা থেকে বাঁচতে পার্শ্ববর্তী পদ্মা বিপণি বিতানের দোতলায় আশ্রয় নেয় পথচারী বিশ্বজিত দাস। কিন্তু ছাত্রলীগের হাত থেকে সে বাঁচতে পারেনি। বিরোধী দল সমর্থক মনে করে সেখানে গিয়ে তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে মৃত ভেবে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যায় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এ সময় সে নিজেকে টেইলার এবং বিরোধী জোটের সমর্থক নয় বলে বার বার বলতে থাকলেও উন্মত্ত সন্ত্রাসীরা তাতে কর্ণপাত করেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রলীগ ক্যাডার শাকিলের নেতৃত্বে তাকে কোপানো হয়। এরপর মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়। বিশ্বজিতের ভাই জানান, শাখারি বাজারের টেইলারের দোকানে যাওয়ার জন্য গতকাল সকালে লক্ষ্মীবাজারের বাসা থেকে বের হন তিনি। কিন্তু তার আর দোকানে যাওয়া হয়নি।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার আবু তানভীর সিদ্দিক বলেন, বিশ্বজিতকে গুরুতর অবস্থায় এক রিকশাচালক হাসপাতালে নিয়ে আসে। প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে ১০ মিনিটের মাথায় মারা যান তিনি। নিহত ব্যক্তির বড় ভাই উত্তম কুমার দাস জানিয়েছেন, তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের ভবেশ্বর। বাবার নাম অনন্ত চন্দ্র দাস। বিশ্বজিত দাস পুরান ঢাকার ৫৩ নম্বর ঋষিকেশ দাস লেনের বাসা থেকে সকালে শাঁখারীবাজারে তার টেইলারের দোকানে যাচ্ছিলেন। ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় ছাত্রদলের কর্মী মনে করে ছাত্রলীগের কর্মীরা তাকে কুপিয়েছে। বিশ্বজিত কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে তিনি দাবি করেন।
রিকশাচালক রিপন মিয়া জানান, সকাল ৯টার দিকে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা তাকে মাথায় ও বুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। এমনকি রড দিয়ে তাকে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। বিশ্বজিতকে মুমূর্ষু অবস্থায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান রিপন মিয়া। ওই সময়ে বিশ্বজিত কথা বলে তার নাম বিশ্বজিত বলে রিকশাওয়ালাকে জানান। রিপন আরও জানায়, ডাক্তারদের অবহেলার কারণে আধাঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সকাল ১০টার দিকে মারা যান।
মিটফোর্ড হাসপাতালে মানষ ঘোষ বাবুরাম নামে এক ব্যবসায়ী জানান, শাঁখারীবাজারে দোকান ভাড়া নিয়েই ‘আমন্ত্রণ টেইলার্স’ নামের একটি দোকান চালাতেন বিশ্বজিত। বিশ্বজিত সকালে বাসা থেকে দোকানে যাচ্ছিল। পথে গণ্ডগোলের মধ্যে পড়ে। সে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ছিল বলে আমি শুনিনি।
লাশের সুরতহাল তৈরির সময় উপস্থিত থাকা সূত্রাপুর থানার এসআই জাহেদুল ইসলাম জানান, সকাল ৯টার দিকে ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে এ ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা বিশ্বজিতের ডান হাতে ও পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে। নিহতের লাশ সুরতহাল শেষে তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় সূত্রাপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে বিশ্বজিতের মৃতদেহ দেখতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকাসহ সিনিয়র নেতারা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান এবং লাশ সত্কার করার জন্য তার পরিবারের সদস্যকে ২০ হাজার টাকা প্রদান করেন। বিশ্বজিতের লাশ তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে নেয়া হয়েছে।

0 অবরোধে অচল দেশ, কাল হরতাল : পুলিশের গুলি টিয়ারের ছত্রছায়ায় ছাত্র-যুবলীগের তাণ্ডব

বিরোধী জোটের ডাকে সর্বাত্মক অবরোধে গতকাল সারাদেশ ছিল অচল। রাজধানী ঢাকাসহ গোটা দেশের যানবাহনশূন্য রাজপথ ছিল সংঘাত, সংঘর্ষ আর মিছিল-পিকেটিংয়ে উত্তাল। সহিংস ঘটনায় বহু এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। এতে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ৩ জন। বিরোধী দল দাবী করেছে নিহতের সংখ্যা ৪। অবরোধ ঠেকাতে পুলিশের ছত্রছায়ায় মারমুখী ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডাররা নৃশংসভাবে হত্যা করে দুজনকে। এর মধ্যে পুরান ঢাকার জজকোর্ট এলাকায় বিরোধীদলীয় কর্মী সন্দেহে বিশ্বজিত দাস নামে এক দোকান কর্মীকে ধারাল কিরিচ ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে উন্মত্ত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। সিরাজগঞ্জে এক জামায়াত কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। আরেকজন নিহত হয় রাজধানীর এয়ারপোর্টের সামনে গাড়িচাপায়। সহিংস ঘটনায় সারাদেশে আহত হয়েছে পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় সমান সংখ্যক বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে। কেবল ঢাকায়ই গ্রেফতার করা হয়েছে ১৬২ জনকে। পিকেটারদের হামলায় শতাধিক গাড়ি ভাংচুর হয় এবং কমপক্ষে ২০টি যানবাহনে আগুন দেয়া হয়েছে ।
এদিকে অবরোধ কর্মসূচিতে সরকারের বাধা, বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, গুলি ও শাসকদলের ক্যাডারদের হামলায় ৪ জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আগামীকাল মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে ১৮ দলীয় জোট। গত রাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন ও জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে এক বৈঠক শেষে এ হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়। এছাড়া আজ সারাদেশে বিক্ষোভ ও সমাবেশের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।
বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী জোটের আহ্বানে সবচেয়ে ঘটনাবহুল কর্মসূচি ছিল গতকালের অবরোধ। সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ দেশে জনজীবন হয়ে পড়ে স্থবির। অবরোধ চলাকালে ব্যাপক সংঘর্ষ, গুলি, রাবার বুলেট, বোমাবাজি, যানবাহনে আগুন, ভাংচুরসহ সহিংস ঘটনা ঘটে। ঢাকার আমিনবাজার এলাকায় বিএনপির মিছিলে সরকার দলীয় ক্যাডারদের কয়েকশ’ রাউন্ড গুলিবর্ষণে ওই এলাকা রীতিমত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। গুলিতে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আলম গুরুতর আহন হন। এখানে বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রেজাউল কবির পল আহত হয়। নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয় গত চার বছরে গতকালই বড় কোনো রাজপথের কর্মসূচিতে আন্দোলনমুখর ছিল।
আগামীকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল : অবরোধে হত্যা, নির্যাতন ও জুলুমের প্রতিবাদে আগামীকাল সারাদেশে হরতাল ডেকেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। একই দাবিতে আজ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচিও দিয়েছে তারা।
গতকাল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেয়া এ সিদ্ধান্তের কথা জানান দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আট ঘণ্টার সংঘাতময় রাজপথ অবরোধের পর পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ড. আর এ গনি, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, এম কে আনোয়ার এমপি, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার এমপি, বেগম সারোয়ারী রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়াও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপি সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা।
শাহজাহানপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে, পুরনো ঢাকায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও মহানগর আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা, যাত্রাবাড়িতে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমিনবাজারে যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, মহাখালীতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের নেতৃত্বে জমায়েত করে অবরোধ পালন করা হয়। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির কর্মীরাও ঢাকার বিভিন্ন স্পটে অবরোধ সৃষ্টি করে। বিজয়নগর এলাকায় জামায়াত শিবির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। টঙ্গী-গাজীপুরে বাসে আগুন ও মহাসড়কে ব্যারিকেডের মধ্য দিয়ে অবরোধ পালিত হয়। টঙ্গী থানা বিএনপি কার্যালয় ভাংচুর করে ছাত্রলীগ কর্মীরা।
কর্মসূচি পালনে চার বছরে প্রথম আন্দোলনমুখর নয়াপল্টন : আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় চার বছরের শাসনে কর্মসূচি পালনে গতকালই প্রথম নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকা ছিল আন্দোলনমুখর। আট ঘণ্টার অবরোধে পাঁচ ঘণ্টা ওই এলাকায় কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। কয়েকশ’ পুলিশ-র্যাব সদস্যের সামনে সড়ক অবরোধ করে ১৮ দলীয় জোটের কয়েক হাজার নেতাকর্মী। ওই এলাকায় পুলিশের আচরণ ছিল নমনীয়।
কাকডাকা ভোরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে অবরোধের সমর্থনে মিছিল বের হয়। ৬টার দিকে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নেতা কার্যালয়ে অবস্থান নেন। ধীরে ধীরে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন।
সকাল ৯টা ৮ মিনিটে ছাত্রদলের কয়েকজন নারী কর্মী হঠাত্ নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনের একপাশের সড়কে বসে পড়েন এবং অবরোধের পক্ষে স্লোগান দেয়। এতে যোগ দেয় যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রশিবির কর্মীরা। ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিক থেকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রফিক শিকদার ও বিএনপি নেতা ননী তালুকদারের নেতৃত্বে শাহবাগ থানা বিএনপির একটি মিছিল আসে। শতাধিক নেতাকর্মীর মিছিলটি কয়েকবার প্রদক্ষিণ শেষে নয়াপল্টন কার্যালয়ের বিপরীত পাশের সড়কে বসে পড়ে। এরপর ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী মিছিল বের করে। পরে যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সালাম আজাদ, যুগ্ম সম্পাদক নেওয়াজ আলী ও মাহবুবুল হাসানের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী এবং পল্টন থানা বিএনপির পৃথক একটি মিছিল কয়েকবার ওই এলাকা প্রদক্ষিণ করে।
এরপর জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের শতাধিক নেতাকর্মী ওই এলাকা ঘুরে ঘুরে মিছিল করে।
ধীরে ধীরে নয়াপল্টন এলাকায় কয়েক হাজার নেতাকর্মী জড়ো হয়। স্লোগান ও বিক্ষোভের আওয়াজ বাড়তে থাকে। ছাত্রদল সভাপতি আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলও শাহবাগ এলাকা থেকে এসে নয়াপল্টনে ছাত্রদল কর্মীদের নিয়ে অবরোধে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ ও পুলিশি হামলায় চারজন নিহত হওয়ার খবর জেনে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা। দেড়টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে সহস্রাধিক নেতাকর্মীর একটি মিছিল আসে নয়াপল্টনে। তখন পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
পরে সেখানে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তৃতা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতারা। বেগম খালেদা জিয়া আহূত অবরোধকে সফল করায় তিনি নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ এবং দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পরে সংবাদ সম্মেলনে দেশব্যাপী অবরোধের চিত্র তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। এরপরও বেলা আড়াইটার দিকে বিএনপি কার্যালয়ের বিপরীত পাশের গলিতে পরপর তিনটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়।
শাহজাহানপুরে গণজমায়েতে সড়ক অবরোধ : গণজমায়েতের মাধ্যমে ৬টা থেকে ২টা পর্যন্ত শাহজাহানপুরে সড়ক অবরোধ করে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে রাজারবাগ মোড় থেকে খিলগাঁও ফ্লাইওভার পর্যন্ত সড়কে কয়েক হাজার নেতাকর্মী স্লোগান, বিক্ষোভ ও খণ্ড খণ্ড সমাবেশ করে।
ভোর ৬টার দিকে দু’দফা মিছিল শেষে সাড়ে ৭টার দিকে সড়কে অবস্থান নেয় বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের নেতাকর্মীরা। সেখানে তারা সমাবেশ করে। সমাবেশে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘বিক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে নেমে এসেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে আছি। ভোটের অধিকার ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবুর পরিচালনায় সেখানে আরও বক্তৃতা করেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব, যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক ইউসুফ বিন জলিল, মোনায়েম মুন্না, মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম মজনু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি সাইফুল আলম পটু, লিটন তালুকদার, মঞ্জুর হোসেন মিলন, কেন্দ্রীয় নেতা যুগ্ম সম্পাদক আনু মোহাম্মদ শামীম, আক্তারুজ্জামান বাচ্চু প্রমুখ।
বিশাল এ জমায়েতের অবরোধে ওই এলাকা দিয়ে কোনো গাড়ি চলাচল করতে পারেনি। দেড়টার দিকে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে তারা নয়াপল্টন কার্যালয়ে সমাবেশে যোগ দেয়।
শাহবাগে ছাত্রদলের মিছিল, পুলিশের গুলি সংঘর্ষে আহত ৮, গ্রেফতার ১৫ : সকাল সোয়া ৬টার দিকে শাহবাগে মিছিল বের করে ছাত্রদল। মিছিলটি শাহবাগ মোড়ের দিকে এগোলে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে একটি গাড়ি ভাংচুর করে ছাত্রদল কর্মীরা। ইট ভেঙে ছাত্রদল কর্মীরা পুলিশের দিকে ছুড়তে থাকে। জবাবে পুলিশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে আট ছাত্রদল কর্মী আহত হয়। পরে তিন ট্রাক পুলিশ ও ছয় গাড়ি র্যাব সদস্য এসে আশপাশ এলাকায় গ্রেফতার অভিযান চালায়। ১৫ ছাত্রদল কর্মীসহ কয়েকজন পথচারীকে গ্রেফতার করে তারা।
পরে শাহবাগ মোড়ে শতাধিক পুলিশ সদস্য অবস্থান নেয় এবং রাবার বুলেট ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেন রমনা জোনের ডিসি নুরুল ইসলাম। ঠিকমত বুলেট ছুড়তে না পারায় দু’পুলিশ সদস্যকে তিনি সাংবাদিকদের সামনে থাপ্পড় মারেন।
গাবতলী রণক্ষেত্র : ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে রাজধানীর অন্যতম প্রবেশপথ গাবতলীতে অবরোধকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও সরকার সমর্থকদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় অন্তত ৫০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ ও মুহুর্মুহু ককটেল বিস্ফোরণে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা দিগ্বিদিক ছুটে পালায়। অবরোধ কর্মসূচি পালনকালে সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র, রামদা, কিরিচ, ছুরি, লাঠিসোটাসহ প্রতিপক্ষের ওপর কয়েক দফায় হামলা চালায়। এ সংঘর্ষের পুরো সময় ধরেই প্রত্যক্ষদর্শীর ভূমিকায় ছিল পুলিশ। তাদের সামনেই গাবতলীতে শতাধিক গাড়ি ও দোকান-পাট ভাংচুর চালায় অবরোধ সমর্থক ও বিরোধীরা। তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন রাস্তায় অবরোধকারী ও বিরোধীদের চেনা না গেলেও প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে হামলা চলে দফায় দফায়। এতে উভয়পক্ষের অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে গাবতলীতে এমন চিত্র দেখা যায়নি। বিগত হরতালগুলোতে গাড়ি ভাংচুরের ঘটনাও ঘটেনি। এবারই প্রথম সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র থেকে মিছিলে গুলিবর্ষণ, বোমা নিক্ষেপ ও গাড়ি-দোকান ভাংচুর করেছে। তাদের বাধার কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও গাড়ি এবং দোকানপাটে ভাংচুর চালিয়েছে।
ঘন কুয়াশায় শীতের মধ্যে সকাল ৬টার আগে রাজপথে নামেন অবরোধ পালনকারীরা। সাড়ে ৬টার দিকে সাবেক সংসদ সদস্য এসএ খালেক, ১১নং ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার শামীম পারভেজসহ বিএনপি নেতারা গাবতলী পৌঁছার সঙ্গে শত শত নেতাকর্মী রাজপথে অবস্থান নেন। এর কিছু সময় পরই জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরের নায়েবে আমির হামিদুর রহমান আযাদ এমপিসহ শিবিরের নেতারা সেখানে পৌঁছেন। এ সময় পর্বতা সিনেমা হল, মাজার রোড, গাবতলী পুলিশ ফাঁড়ি ও টেকনিক্যাল মোড়ে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট সার্বক্ষণিক মোতায়েন রাখা হয়। সকাল ৭টার পরে গাবতলীর কোটবাড়ী এলাকায় হানিফ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে অবস্থান নিয়ে যখন এসএ খালেকের নেতৃত্বে পথসভা চলছিল, ঠিক তখনই মাজার রোডে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও জড়ো হতে থাকেন। এর আগে ভোর সাড়ে ৬টা থেকে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল ও ছাত্রশিবির পৃথক মিছিল বের করে। এ সময় কয়েকটি অটোরিকশা ও গাড়ি চলতে দেখলে ধাওয়া দেয় অবরোধকারীরা।
ঘন কুয়াশায় শীতের সকালে শান্ত পরিবেশে সকাল সাড়ে ৭টায় গাবতলীতে উত্তাপ ছড়ায় ছাত্রলীগের প্রথম মিছিল। ঢাকা-আরিচা সড়কে ছাত্রলীগের মিছিল থেকে বিপরীত রাস্তায় ১৮ দলীয় জোটের মিছিলে লাঠিচার্জ করা হয়। এর পরই শুরু হয় মৃদু ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এ সময় ছাত্রলীগের মিছিল থেকে অন্তত ৩ রাউন্ড গুলি ও কয়েকটি ককটেল ছোড়া হয়। জবাবে ২টি টায়ার জ্বালিয়ে ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রতিবাদ জানায় হরতাল সমর্থকরা। এ সময় ছাত্রলীগের নেতকর্মীরা পিছু হটে মাজার রোডে অবস্থান নেয়। একই সময় বিএনপির একটি বিক্ষিপ্ত দলকে লাঠিসোটাসহ ধাওয়া দিলে বসুপাড়া তৃতীয় কলোনিতে পিছু হটিয়ে দেয়া হয়। বিএনপির কয়েকজনকে বেধড়ক পিটুনি দেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন শরীফের নেতৃত্বে মিছিল থেকে প্রকাশ্যে গুলি ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সকাল ৮টায় কোটবাড়ী থেকে গাবতলী আন্ডারপাসের দিকে বিএনপির মিছিল পৌঁছলে আবারও কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় আওয়ামী লীগ। শুরু হয় আবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও গাড়ি ভাংচুর। এরপরই পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে বিরোধীদের ধাওয়া দেয়। শুরু হয় আবারও সংঘর্ষ। সকাল সোয়া ৮টার দিকে আন্ডারপাসের কাছে অবস্থান নেয়া আওয়ামী লীগ ও পুলিশকে লক্ষ্য করে বিএনপি-জামায়াত নেতকর্মীরা ধাওয়া দিলে পুলিশ গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় রাস্তার পাশে পার্কিং করা গাড়ি ভাংচুর করে অবরোধকারীরা। এভাবে গাবতলীতে কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে দুই পাশের রাস্তা লাল হয়ে যায়। সকাল সোয়া ১১টা থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত মিছিল করে রাজপথে একক আধিপত্য বিস্তার করে ক্ষমতাসীনরা। তারা রাস্তার দু’পাশে রাখা গাড়ি ও দোকানগুলোতে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। আশপাশের ভবনগুলোতে উত্সুক জনতাকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়ে তারা। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতা ড. বদরুজ্জামানের ছেলে সুমেল মোটরসাইকেলে চড়ে প্রকাশ্যে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে অন্তত ১০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীরা অস্ত্রসহ সুমেলের ছবি তুলতে গেলে পালিয়ে যান তিনি। একইভাবে বেলা ২টা পর্যন্ত ধাওয়া-পাল্টা চলে। এ সময় কয়েকজন পথচারী ও পরিবহন শ্রমিককে কুপিয়ে আহত করে ক্ষমতাসীনরা।
এদিকে মিরপুরের বিএনপি নেতা মো. শহীদ উল্যাহ মজুমদারের নেতৃত্বে সকাল ৭টায় একটি বিশাল মিছিল মিরপুর বাঙলা কলেজ, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল মোড়, গাবতলী ও মিরপুর-১-এ বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে সড়ক অবরোধে মিছিল বের করেন। মিছিলটিতে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করলে শহীদ উল্যাহ মুজমদারসহ ১০-১২ নেতাকর্মী আহত হন।
আমিনবাজারে বিএনপি নেতাদের গুলি করল পুলিশ : অবরোধের সমর্থনে রাজধানীর উপকণ্ঠ আমিনবাজারে শান্তিপূর্ণ পথসভায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর গুলি ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এ ঘটনায় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য নাজিম উদ্দিন আলম গুলিবিদ্ধ হন। আহত হন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সহ-সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সভাপতি রেজাউল কবীর পলসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। এরপরই পুলিশের ছত্রছায়ায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এর আগে সকাল পৌনে ৭টার দিকে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দু’জন আহত হয়। ৬ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একজন বিদেশি নাগরিক বহনকারী গাড়িতে আগুন ও কয়েকটি গাড়িতে ভাংচুর চালায় অবরোধ পালনকারীরা।
ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া দিয়ে ক্ষমতাসীনদের হটিয়ে সকাল ৭টা থেকে রাজপথের দখল নেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমানের নেতৃত্বে নাজিম উদ্দিন আলম, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, আমিনবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিনসহ কয়েকজন নেতার উপস্থিতিতে পথসভা চলতে থাকে। এ সময় পুলিশ জলকামান ও এপিসি মোতায়েন করলে পথসভায় কিছুটা উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে র্যাব-৪-এর সিইও লে. কর্নেল কিসমত হায়াতের বিশাল গাড়িবহরের পেছনে কয়েকটি ট্রাক সভা অতিক্রমের চেষ্টা চালালে তাতে ভাংচুর চালান বিএনপি নেতাকর্মীরা। সর্বশেষ সকাল ১১টার দিকে সিটি করপোরেশনের ৩টি আবর্জনাবাহী গাড়ি আমিনবাজার পৌঁছলে ভাংচুর চালায় অবরোধকারীরা। এ সময় পুলিশ তাদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল সোয়া ১১টার দিকে যখন গাবতলীতে ক্ষমতাসীনদের তাণ্ডব চলছিল, ঠিক তখনই বিএনপির শান্তিপূর্ণ পথসভায় পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও রাবার বুলেট ছুড়ে পুলিশ। এতে নাজিম উদ্দিন আলম দেহে চারটি স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়েছিলেন। গণমাধ্যম কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে চিকিত্সার জন্য হাসপাতালে পাঠান। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, রেজাউল কবীর পলসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। এরপরই পুলিশের ছত্রছায়ায় রাজপথের দখল নেয় আওয়ামী লীগ।
মিছিলে গুলিবর্ষণের কথা স্বীকার করে ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শেখ রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিল চলা অবস্থায় হঠাত্ তারা সিটি করপোরেশনের গাড়ি ভাংচুর করে। তখনই পুলিশ অ্যাকশনে যায় এবং শটগানের গুলি ছুড়ে।
পুরান ঢাকায় ছাত্রদল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা : রাজধানীর পুরান ঢাকায় বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় বাহাদুর শাহ পার্কের পাশে ছাত্রলীগের উপর্যুপরি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সূত্রাপুর থানা ছাত্রদল কর্মী বিশ্বজিত্ দাশ (২৪) নিহত হয়। এছাড়াও ছাত্রলীগ কর্মীরা মহানগর দায়রা জজ আদালতের মধ্যে ঢুকে লাঠি, স্টিলের পাইপ ও রড দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গুরুতর আহত করে। এ সময় তারা বার সমিতির কার্যালয়ে ব্যাপক ভাংচুর চালায়।
জবি ছাত্রদল সভাপতি গুলিবিদ্ধ : পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল মিছিল করার সময় পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে আহত হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল ৫ ছাত্রদল নেতাকর্মী। সকাল ৮টায় এ ঘটনা ঘটে।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় অবরোধ, হামলা, গুলি : কাজলা এলাকায় সকাল ৭টার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হলে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা হামলা চালায়। এ সময় কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে অবরোধ সমর্থনকারীরা। একই সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিছিলকারীদের ওপর। শুরু হয় পুলিশ, যুবলীগ ও অবরোধকারীদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সংঘর্ষ। পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে প্রায় ২০ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে বিএনপি ও ছাত্রদলের ১০ নেতাকর্মী আহত হন। এরই মাঝে র্যাব ও বিপুলসংখ্যক পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।
যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে আহতদের মধ্যে যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আ.ক.ম মোজাম্মেল হলি ফ্যামেলি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন। মাহবুব হোসেন মাইকেল নামে এক যুবক বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ ও যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের সামনে মো. রাসেল নামে একজন গুলিবৃদ্ধ হয়। পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। তারা দু’জন ছাত্রদল কর্মী বলে জানা যায়। তাদের বাড়ি যাত্রবাড়ীর শনির আখড়া এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় সকাল ৭টায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় অবরোধকারীরা। খবর পেয়ে দাঙ্গা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে পিকেটারদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এতে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ যোগ দেয়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পুলিশ, অবরোধকারী ও যুবদল কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
র্যাবের সামনেই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুবলীগের মহড়া : এসব সংঘর্ষের পর ওই এলাকায় র্যাব ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে র্যাব নিয়ন্ত্রণে নেয়। ওই এলাকায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মোটরসাইকেল এবং লেগুনাতে করে মহড়া দিতে দেখা যায়। সরেজমিন দেখা গেছে, র্যাব যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা ও ফ্লাইওভারের নিচের এক পাশের সড়কে সব ধরনের যান চলাচল দুপুর পর্যন্ত বন্ধ রাখে। এ সময় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সরকারি দলের লোকজনকে মহড়া দিতে দেখা গেছে। র্যাবের সামনে মোটরসাইকেলে করে প্রকাশ্যে গজারি কাঠের লাঠি ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুবলীগ ক্যাডাররা মহড়া দেয়। অবৈধ অস্ত্র নিয়ে তারা প্রকাশ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও এলিট ফোর্স বলে পরিচিত র্যাব কর্মকর্তাদের সামনে মহড়া দিলেও সরকারদলীয় ওই ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তো নেইনি; বরং তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। এতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
অবরোধের কারণে সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে কোনো গাড়ি বের করেননি মালিকরা। এ ব্যাপারে এক বাস মালিক আওয়াল হোসেন জানান, গাড়ি বের করলে অবরোধকারীরা ভাংচুর করতে পারে। এ জন্য তিনি তার গাড়ির চালককে বাস নিয়ে বের হতে দেননি।
শনির আখড়া : এদিকে সকাল ৭টার দিকে শনির আখড়া এলাকায় ছাত্রশিবির মিছিল বের করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রশিবিরি মিছিল নিয়ে রাস্তায় এলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। এ সময় শিবির নেতাকর্মীরা রাস্তায় ২-৩টি গাড়ি ভাংচুর করে। পরে অবরোধ সমর্থনবকারীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এছাড়াও সায়েদাবাদ এলাকায় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ছাত্রশিবির মিছিল বের করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পরে পুলিশ ধাওয়া করে শিবিরের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
গোলাপবাগ : সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গোলাপবাগ এলাকায় সালসাবিল পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। গোলাপবাগ এলাকায় বিশ্বরোডে কে বা কারা একটি গাড়ির (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৪৪৯৩) পেছনের সিটে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় রাস্তায় থাকা আরো দুটি গাড়ি দ্রুত সরিয়ে নেয় গাড়ির চালকরা। গাড়ির মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, শনিবার রাতে গাড়িটি মেরামত করার জন্য গোলাপবাগ এলাকায় রাস্তার পাশে রাখা হয়। সকালে গাড়ির নিচের দিকে কাজ করছিল হেলপার। এ সময় কে বা কারা হঠাত্ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায়। দ্রুত ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে গাড়িতে আগুন লাগানোর পরই র্যাব-১০-এর বিপুল সংখ্যক সদস্য এসে মহড়া দিয়ে চলে যায়।
পান্থপথে পুলিশ ভ্যানে আগুন : ভোর ৬টার দিকে রাজধানীর পান্থপথে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয় অবরোধ সমর্থকরা। শেরেবাংলানগর থানার কাভার্ড ভ্যানে কে বা কারা আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে দুই পুলিশ সদস্য আহত হন।
কাফরুল : ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচি পালনে রাজধানীর কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়ায় পৃথক মিছিল বের করেছে অবরোধকারীরা। তারা পুলিশের গাড়িসহ কয়েকটি গাড়িতে ভাংচুর চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষ বেধে গেলে অবরোধকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে যুবদলের ১৪নং ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শফিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন নেতাকর্মী।
সুপ্রিমকোর্টের সামনে আইনজীবীদের সড়ক অবরোধ : সকাল সোয়া ১০টায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদ সুপ্রিমকোর্ট থেকে একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি সুপ্রিমকোর্টের প্রধান ফটকের সামনের সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। এ সময় মিছিলকারীরা রাস্তায় বসে পড়ে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। প্রায় আধাঘণ্টা তারা সেখানে অবস্থান করে। এক পর্যায়ে পুলিশের রমনা জোনের এসি শিবলি নোমান এসে তাদের সরিয়ে দিতে পেট্রোল ইন্সপেক্টর ইমানুলকে নির্দেশ দেন।
এর কিছুক্ষণ পর র্যাবের একটি দল, পুলিশের জলকামান এবং অতিরিক্ত পুলিশ সেখানে গেলে মিছিলকারীদের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে মিছিলকারীরা গেটের ভেতরে গিয়ে সমাবেশ করে।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী পরিষদের সভাপতি ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তৃতা করেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, নিতাই রায় চৌধুরী, শাহ খসরুজ্জামান, নাসির উদ্দিন অসিম, কায়সার কামাল, রুহুল কুদ্দুছ কাজল, গাজি কামরুল ইসলাম সজল প্রমুখ।
মহাখালীতে রাস্তা অবরোধ, সংঘর্ষ, আটক ১৩ : মহাখালীতে রাওয়া ক্লাবের সামনে সকাল থেকে রাস্তা অবরোধ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের নেতাকর্মীরা। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারুকের নেতৃত্বে এ অবরোধ শুরু হয়। জামায়াত-শিবিরের ব্যানারে বহু সংখ্যক নেতাকর্মীও এতে অংশ নেয়। অবরোধকারী ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনার এক পর্যায়ে বেলা ১১টার দিকে শিবির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে তেজগাঁও রোডের দিকে গিয়ে শেষ করে। একই সময়ে ছাত্রদলের ব্যানারে রাওয়া ক্লাব থেকে মহাখালীর দিকে এবং বনানী থেকে মহাখালীর দিকে পৃথক দুটি মিছিল বের হয়ে মহাখালী তিন রাস্তার মোড়ে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি-ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশ এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে এবং কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই এলাকায় দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ এখান থেকে ১৩ জনকে আটক করে। সকালে এখানে একটি ট্যাক্সিক্যাবে আগুন দেয়া হয়। নাবিস্কো এলাকায় পৃথক মিছিল বের করে বিএনপি। এ সময় বুলেটপ্রুফ গাড়ি নিয়ে পুলিশ ওই রাস্তায় মহড়া দেয়। মহাখালীতে অবরোধকালে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আরও ছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু, জেনারেল (অব.) রুহুল আলম, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লায়ন হারুনুর রশীদ এমপি, তিতুমীর কলেজের সাবেক ভিপি শামছুল হক, নুরুল হুদা নুরু, আবদুল আলিম প্রমুখ। এছাড়া জামায়াতের মহানগরী নেতা এসএম আলাউদ্দিন ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক আবু সালেহ মো. ইয়াহইয়া উপস্থিত ছিলেন।
বাসাবো-খিলগাঁও : সকাল থেকেই বাসাবো এলাকার রাস্তায় কড়া অবস্থান নেয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। সকাল ৮টার দিকে বাসাবো স্কুল মাঠ এলাকা থেকে বিএনপি খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করে দক্ষিণ বাসাবো মোড়ে সমাবেশ করে। এ সময় তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। ওই সড়ক দিয়ে কোনো রিকশা-সাইকেল পর্যন্ত চলতে দেয়া হয়নি। সাড়ে ৮টার দিকে স্কুল মাঠের সামনে থেকে জামায়াত-শিবির একটি মিছিল বের করে। দলের মহানগর সহকারী সেক্রেটারি সেলিমউদ্দিনের নেতৃত্বে মিছিলে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াত নেতা ড. রেজাউল করিম, ইয়াছিন আরাফাত প্রমুখ। মিছিল চলাকালে ফ্লাইওভার সংলগ্ন বাসাবো মোড়ে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব উপস্থিত ছিল। এদিকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খিলগাঁও রেলগেটের কাছে ফ্লাইওভারের নিচে বিআরটিসির একটি দোতলা বাস ভাংচুর ও আগুন দেয়ার চেষ্টা করে অবরোধকারীরা। এ সময় পুলিশ অবরোধকারীদের লাঠিচার্জ শুরু করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে পুলিশসহ ১৮ দলের কয়েকজন আহত হয়। ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
টঙ্গীতে সর্বাত্মক অবরোধ, বিএনপি অফিস ভাংচুর করেছে ছাত্রলীগ : অবরোধ চলাকালে রাজধানীর প্রবেশমুখ শিল্পনগরী টঙ্গী ছিল ১৮ দলীয় জোটের দখলে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আলহাজ হাসান উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় নেতাকর্মীরা ভোর ৬টা থেকে রাজপথ অবরোধ করে। টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় সকাল ৮টায় র্যাবের একটি গাড়ি ঘন কুয়াশার মধ্যে বিএনপির মিছিলের কাছাকাছি এসে পড়লে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় অবরোধকারীরা র্যাবের গাড়িটি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে।
অবরোধ চলাকালে মহাসড়কজুড়ে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা। টঙ্গী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম শুক্কুর, গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরাফত হোসেন, জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রভাষক বসির উদ্দিন আহমেদ, যুবদল নেতা রফিকুল আজিজ প্রিন্স, রাশেদুল ইসলাম কিরণ, হাজী বিল্লাল হোসেন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শাহনুর ইসলাম রনি সরকারের নেতৃত্বে পৃথক মিছিল মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে।
অবরোধ চলাকালে রোববার সকালে টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় একটি ট্রাক, মোটরসাইকেল ও মিরের বাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুরের খবর পাওয়া গেছে। সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত অবরোধ চলাকালে সড়ক-মহাসড়কগুলো ছিল ফাঁকা। রিকশা ও বাইসাইকেল চলাচল করতেও দেখা যায়নি। বেলা ২টা পর্যন্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা, বিপণি বিতান এমনকি চা স্টলও ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ। সকাল সাড়ে ৯টায় স্থানীয় হোসেন মার্কেট এলাকা থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একটি মিছিল বের করলে অবরোধকারীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় এক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। বেলা ১১টায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৫০/৬০ জনের একটি জঙ্গি মিছিল স্থানীয় হোসেন মার্কেট এলাকা থেকে বের হয়ে স্টেশন রোড আওয়ামী লীগের অফিসের দিকে চলে যায়। এ সময় তারা পুলিশ ও র্যাবের সামনেই মহাসড়কের দুই পাশে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, এনসিসি ব্যাংক এবং ট্রাক স্ট্যান্ডে ঢুকে ২০/২৫টি ট্রাক ও টঙ্গী থানা বিএনপি অফিস ভাংচুর করে ।
জামায়াত-শিবিরের তত্পরতা : ১৮ দলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচিতে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের বেশ তত্পরতা ছিল। ১৮ দলীয় জোটের ব্যানার ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পৃথক ব্যানার নিয়ে রাস্তা অবরোধ ও মিছিল-সমাবেশ করে জামায়াত-শিবির। সকাল থেকেই গাবতলী এলাকায় জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক সংখ্যক নেতাকর্মী অবস্থান নেয়। এ সময় দলের মহানগর নায়েবে আমির হামিদুর রহমান আযাদ এমপির নেতৃত্বে মিছিল করে জামায়াত। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে জামায়াত ও বিএনপি নেতাকর্মীদের কয়েক দফা ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হন অনেক নেতাকর্মী।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জামায়াতের মহানগর সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল ও সহকারী সেক্রেটারি সেলিমউদ্দিনের নেতৃত্বে নয়াপল্টনে এক বিশাল মিছিল বের করে। মিছিলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পল্টন থানা আমির অধ্যাপক মোকাররম হোসাইন খান ও শিবিরের কেন্দ্রীয় এইচআরডি সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত প্রমুখ। মিছিলটি ফকিরাপুল থেকে শুরু হয়ে বিজয়নগর মোড়ে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সাড়ে ৮টায় সবুজবাগে মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয়। এ সময় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে নেতাকর্মীরা। মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মঞ্জুরুল ইসলাম ভুইয়ার নেতৃত্বে সকালে নয়াবাজারে একটি মিছিল সমাবেশ ও রাস্তা অবরোধ করে নেতাকর্মীরা। যাত্রাবাড়ীতে ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা ও আবদুস সবুর ফকিরের নেতৃত্বে মিছিল সমাবেশ করে জামায়াত। মহাখালীতে জামায়াত নেতা এএসএম আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে মিছিল সমাবেশ ও অবরোধ করা হয়। মিরপুরে আবদুর রহমান মুসা ও লস্কর মো. তসলীমের নেতৃত্বে মিছিল সমাবেশ করে জামায়াত। এছাড়া সায়েদাবাদ, শনির আখড়া ও কাজলা এলাকায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল করার সময় ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়।
খেলাফত মজলিস : ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুগ্মমহাসচিব শেখ গোলাম আসগরের নেতৃত্বে, গাবতলীতে মহানগর সভাপতি মাওলানা নোমান মাযহারীর নেতৃত্বে, খিলগাঁও-শাহজাহানপুরে কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবদুল জলিলের নেতৃত্বে মজলিস কর্মীরা অবরোধে অংশগ্রহণ করে এবং বেলা ১টায় যুগ্মমহাসচিব মাওলানা শফিক উদ্দিনের নেতৃত্বে নয়াপল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়। এছাড়া সারাদেশে মহানগরী ও জেলা পর্যায়ে খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীরা রাজপথ অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। দুপুরে দলীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং করেন দলের আমির মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক।
এলডিপি, কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশ ন্যাপ : সকাল পৌনে ১০টার দিকে এলডিপি, কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশ ন্যাপের যৌথ মিছিল ফকিরাপুল থেকে শুরু হলে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারা আবারও পল্টনে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। পরে পুরানা পল্টনে কল্যাণ পার্টি কার্যালয়ে এক যৌথ প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পার্টির মহাসচিব আবদুল মালেক চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, এলডিপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম, কল্যাণ পার্টি যুগ্ম মহাসচিব এম.এম. আমিনুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক এস.এম. শরিফুল ইসলাম প্রমুখ।
রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে ছাত্রদল, আটক-আহত শতাধিক : অবরোধ সফল করার সমর্থনে রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ছাত্রদল। এসব মিছিলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা অন্তত অর্ধশত আহত হয়েছে। পুলিশ ৫০ নেতাকর্মীকে আটক করেছে। সকাল সাড়ে ছয়টায় রাজধানীর শাহাবাগ এলাকায় ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিবের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রদল। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। ছাত্রদলের অভিযোগ, এ সময় পুলিশের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় ৩০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এ সময় ২৬ জনকে আটক করে পুলিশ। এছাড়া ছাত্রদল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসহাক সরকারের নেতৃত্বে সকালে মিছিল বের হয়। এতে পুলিশের লাঠিচার্জে ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনামুল হক এনামের নেতৃত্বে ফকিরাপুলে বিক্ষোভ হয়। এতে পুলিশের লাঠিচার্জে ১৫ নেতাকর্মী আহত হয়। ছাত্রদল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সজল ও সাধারণ সম্পাদক ওমরের নেতৃত্বে কোর্ট কাচারী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এতে পুলিশের ব্যাপক লাঠিচার্জে ১৫ জন আহত হয়। ছাত্রদল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সকালে কাওরানবাজার পেট্রোবাংলার সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে। এতে পুলিশের হামলায় ৫ জন আহত হয়। ছাত্রদল ঢাকা কলেজ সভাপতি আল মামুন তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম মিঠুর নেতৃত্বে ওই কলেজের সামনে সকাল ৭টায় অবরোধের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর সিনিয়র সহ-সভাপতি শরীফ উদ্দিন জুয়েল ও তিতুমীর কলেজ সভাপতি ইসমাইল খান শাহিনের নেতৃত্বে সকালে মহাখালীতে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।
ইসলামী ঐক্যজোটের মিরপুর শাখার সভাপতি গাজী ইয়াকুবের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ফজরের নামাজের পরে টেকনিক্যাল মোড় অবরোধ করে। পরে সকাল সাতটার দিকে বাংলা কলেজের ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বে একদল ক্যাডার দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ধাওয়া করলে ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা নিকটবর্তী একটি মসজিদে আশ্রয় নেয়। এরপর স্থানীয় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ঐক্যজোটের সঙ্গে যোগ দিলে ছাত্রলীগ আবারও তাদের ওপর হামলা চালায়।

0 দুর্নীতিতে ২৪ ধাপ অবনতি

দুর্নীতি বিস্তারের ক্ষেত্রে গত এক বছরে বাংলাদেশের ২৪ ধাপ অবনতি হয়েছে। গতকাল প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক দুর্নীতির ধারণা সূচকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। টিআই পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচকে’ গত বছর বিশ্বের ১৮৩টি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যে সূচক করা হয়েছিল, তাতে ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০ নম্বরে। আর এবার ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দুর্নীতিতে অবনতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে ৫টির অবস্থানের উন্নতি হয়েছে। অবনতি হয়েছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের। এর মধ্যে পাকিস্তানের অবনতি ৫ ধাপ আর বাংলাদেশের ২৪ ধাপ। স্কোরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়েছে। ২০১১ সালের ২৭ স্কোর কমে এবার হয়েছে ২৬। রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩ নম্বরে। এ বিবেচনায় গত বছরও বাংলাদেশ একই অবস্থানে ছিল।
বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গতকাল সারাবিশ্বে একযোগে এ রিপোর্ট প্রকাশ করে। বাংলাদেশে রিপোর্ট প্রকাশকালে বলা হয়, বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। সকালে রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নগামী; কারণ স্কোর কমেছে। এ অবস্থা উদ্বেগজনক। গত বছর ১০-ভিত্তিক স্কেলে সূচক নির্ধারণ করা হলেও এবার অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে একশ-ভিত্তিক স্কেলে। গত বছর ১০-এ বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২.৭। আর এবার ১০০-তে ২৬।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিয়ে সম্প্রতি টিআইবি সরকারের তোপের মুখে পড়ে। সংসদের ভেতরে-বাইরে সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীরা টিআইবিকে তুলোধুনো করেই থামেননি, বাংলাদেশে সংস্থাটিকে নিষিদ্ধ করারও দাবি তুলেছেন। শতকরা ৯৯ ভাগ সংসদ সদস্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িত—এমন গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করার জন্য তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এমনই পরিস্থিতিতে গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করে। টিআইবি’র নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীলরা না থাকলে এবারের রিপোর্ট আরও খারাপ আসত বলে সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা। রিপোর্ট প্রকাশের সময় সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল উপস্থিত ছিলেন।
টিআই’র প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ২০১১ সালের সঙ্গে ২০১২ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানগত পরিবর্তন না হলেও গত এক বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, রেল দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগের কথা।
এবারের সূচক অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। এ তিন দেশের স্কোর ১০০-তে ৯০। গত বছর ভালোর তালিকায় শীর্ষে ছিল নিউজিল্যান্ড। ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড ছিল দুই নম্বরে।
এবার সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির দেশ হিসেবে এসেছে আফগানিস্তান, কোরিয়া ও সোমালিয়ার নাম। দেশগুলোর স্কোর ১০০-তে ৮। গত বছর সর্বশেষ অবস্থানে ছিল শুধু সোমালিয়া ও উত্তর কোরিয়া।
এর আগে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬-২০০১ আমলের শেষ বছরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০০৫ সাল থেকে (২০০৬ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে) বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শীর্ষ অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। চারদলীয় জোট সরকারের সময় দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বর থেকে তৃতীয়তে উন্নীত হয় এবং বিএনপি জোটের শেষ বছর ২০০৬ সালে (রিপোর্ট প্রকাশ ২০০৭ সালে) অবস্থার আরও উন্নতি হয়ে ৭ নম্বরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। পরের বছরগুলোতে যথাক্রমে ১০, ১৩, ১২ এবং ১৩তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।
বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি নিয়ে প্রতি বছর এ ধারণাসূচক প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির দাবি, এ সূচকে দুর্নীতি বিস্তারের একটি ধারণা পাওয়া যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র : দক্ষিণ এশিয়া তথা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। তাদের স্কোর ১০০-তে ৬৩। ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী তাদের অবস্থান ৩৩। দেশটি এক বছরে পাঁচ ধাপ উন্নতি করেছে। গত বছর তাদের অবস্থান ছিল ৩৮ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ শ্রীলঙ্কা। দেশটি ৪০ স্কোর করে ৭৯ নম্বরে অবস্থান করছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ভারত। দেশটি ৩৬ স্কোর করে ৯৪ নম্বরে উঠেছে। গত বছর তাদের স্কোর ছিল ২৭ এবং অবস্থান ছিল ১২০ নম্বরে। বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা অপর দুটি দেশ হচ্ছে পাকিস্তান ও নেপাল। এ দুটি দেশ ২৭ করে স্কোর করেছে এবং যুগ্মভাবে তাদের অবস্থান ১৩৯ নম্বরে। পাকিস্তানের স্কোর ৫ পয়েন্ট এবং নেপালের ২ পয়েন্ট বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় স্কোর কমেছে একমাত্র বাংলাদেশের। স্কোর ১ কমে ২৬-এ নেমেছে এবং অবস্থান ১২০ থেকে একলাফে ২৪ ধাপ নেমে ১৪৪-এ পতিত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের মধ্যে মালদ্বীপ এ বছর সিপিআই সূচকে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি।
অবস্থা উদ্বেগজনক : ড. ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নগামী। এর কারণ স্কোর কমেছে। এ অবস্থা উদ্বেগজনক। ধারণা সূচকে এবার বাংলাদেশের স্কোর ২৬, যা গত বছরের তুলনায় এক পয়েন্ট কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছরে বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, রেল দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগের বিষয়।
টিআইবির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এটা প্রতিষ্ঠানটির ১৮তম বার্ষিক দুর্নীতির ধারণা সূচক। এবারের সূচকে বিশ্বের ১৭৬টি দেশের পাবলিক সেক্টরের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সমান স্কোর করেছে ক্যামেরুন, ইউক্রেন, কঙ্গো রিপাবলিক, সিরিয়া ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক।
রিপোর্টে বলা হয়, দুর্নীতি একটি মারাত্মক বৈশ্বিক সমস্যা। কোনো দেশই ১০০ স্কোর পায়নি। কম দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত অনেক দেশই ৮০ স্কোরের কম পেয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে জার্মানি, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, স্পেন ও ইতালি। ১৭৬টি দেশের মধ্যে ১২৪টি দেশ ৫০-এর কম স্কোর পেয়েছে। বৈশ্বিক গড় (সহনীয় দুর্নীতি) ৪৩ স্কোরের কম পাওয়া দেশের সংখ্যা ৬৭টি।

0 সেয়ানা বিপ্লবী তাহের আর ৭ ই নভেম্বরের ছায়া নায়কদের অস্পষ্ট কায়া...........


১৭ ই নভেম্বর, ২০১১ রাত ১২:২২ |

শেয়ারঃ
224 1


এ বছর মার্চে বাংলাদেশে জাতীয় এবং আন্তর্জাতীয় সংদের ভং ভনিতায় একটি যাত্রা পালা হয়ে গেলো হাইকোর্টের চত্বরে.........
এই যাত্রাটির নাম : জিয়া খারাপ - তাহের ভালো..........

বলাই বাহুল্য :
প্রযোজক সংস্থা : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ......
পরিচালক : শামসুদ্দীন অ্যান্ড গোবিন্দ কোং.....
পান্ডুলিপি : বাংলাদেশ দা আনফিনিশড রেভ্যুলেশন
পরিবেশক সংস্থা : প্রথম হলুদ , কলিকাল , কাকের কন্ঠ দালাল গং......

তো এই যাত্রা পালা মন্চ্ঞস্থ করতে গিয়ে উন্মাদ প্রায় আওয়ামী হিস্টিরিয়াগ্রস্ত পরিচালক মশায় তথা শামসুদ্দীন সাহেব বলে বসেছেন :

তাহের জিয়ার ক্ষমতা দখল ঠেকাতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন.......
তাহের নিজে কি করতে চেয়েছিলেন তাহলে ?
ললিপপ চুষতে চেয়েছিলেন ?

তাহলে একটু খোঁজাখুজি করে দেখা যাক স্বাদে গন্ধে রঙে চঙে কেমন ছিলো সেই স্বপ্ন অ্যান্ড বিপ্লব ফ্যাক্টরীর ললিপপ...........



আসলে তাহের এবং তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দ জিয়াকে সামনে রেখে , জিয়ার মুক্তিযুদ্ধকালীন ভাবমূর্তিকে কাজে লাগিয়ে সুচতুরভাবে ক্ষমতা দখলের প্রয়াস নেন ৭ ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে.......কিন্তু এত কিছুর পরও চেইন অফ কমান্ড এবং সেনাপ্রধান পদের অন্তর্নিহিত শক্তি ও আনুগত্যের কাছে তারা পরাজিত হন....... তাহেরকে এর জন্য চরম মূল্যও দিতে হয়.........

বোল্ডেড কোটেশনটা আমার না........
এই কথাগুলো বংগবন্ধু ভক্ত বীরবিক্রম শাফায়াত জামিলের..........
ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর / পাতা ১৪৯ / মধ্যাংশ :


ইতিহাস নিয়ে সদা সংশয়বাদী মনকে সামাল দিতে এর উপর আরেক প্রস্থ জানুন.........
সেনাদের ভেতর জিয়ার ইমেজ ঈর্ষনীয় পর্যায়ে ছিলো। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়ার ভারী গলায় ঘোষনা সেনাসহ সর্বস্তরের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো , ফলে তার একটা আলাদা ইমেজ ছিলো।কর্ণেল আবু তাহের সেইসুযোগ আগ বাড়িয়ে গ্রহন করেন......জিয়াকে গৃহবন্দী থেকে উদ্ধার করতে হবে - এই দাবী সামনে নিয়ে এসে ক্যান্টনমেন্টে সেনা এবং সিভিল কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে একত্র করেন তিনি। সংগে রাখেন সৈনিকদের ১২ দফা দাবী..............

বক্তব্যের বক্তা কে সেটা জানার নিশ্চয়ই একটা কৌতুহল কাজ করছে......
কৌতুহলটা মেটান এখানে / ছবিটির একেবারে বামদিকের জন

চিনতে পেরেছেন ?
জ্বী , অকৃত্রিম আওয়ামী বন্ধু বীরবিক্রম মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীই কথা গুলো বলেছেন.......
প্রশ্ন : কবে কোথায় বলেছেন / নভেম্বর ৭ / ২০১০ / প্রথম আলোতে.......

এ বিষয়ে আরেকটি ভাষ্য পাওয়া সেসময়কার সব ঘটনার স্বাক্ষি কর্ণেল হামিদের কাছেঃ
জাসদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক শ্রেনীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা , যদিও কর্ণেল তাহেরের লক্ষ্য ছিল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল। তাহের সৈনিকদের ১২ দফা দবি প্রণয়ন করে........তাহেরের মতে , জিয়ার সাথে তার আগেই এসব বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তাহেরের ভেবেছিল সে-ই অধিক বুদ্ধিমান । জিয়াকে ব্যবহার করে সে ক্ষমতায় আরোহন করবে ! কিন্তু তার সেই ক্যাল্কুলেশন ভুল হয়েছিল........

ব্লগের শুরুটা তাহেরের বিপ্লবের নেপথ্য অভিলাষের প্রতি প্রশ্নের ল্যাসো ছুড়ে দিয়ে হলেও এই প্রশ্নরজ্জুটি অনেক উপপ্রশ্নের লতায় লতায় জড়ানো প্যাচানো - সোজা ইংরেজিতে টুইস্টেড.........

সেখান থেকেই একটি উপপ্রশ্ন আনটুইস্ট করে নিলাম উত্তর সরলীকরনের স্বার্থে............

প্রশ্নটি হলোঃ তাহের কি জিয়ার জীবন রক্ষক ছিলো ?

মুলত বাংলাদেশের ইতিহাস পাড়ায় প্রায়ই আওয়ামী বাম ইতিহাস ঢুলিরা একটি ঢেড়া পেটায় , অনেকটা ঢাকাই সিনেমার রিকশা ক্যানভাসিং এর মতঃ
জিয়ার জীবন রক্ষক তাহের , জিয়ার প্রানভিক্ষাদান কারী তাহের............
৭৬ এ ঠিক বাংলাদেশে যেমন , তেমনি ৭৭ এ ভারতের আভ্যন্তরীন চরকায় তেল দিতে গিয়ে হাসিনার ২য় মাতা ইন্দিরা গান্ধির কানমলা খেয়ে ভারত বিতাড়িত মার্কিন সাংঘাতিক লরেঞ্জ লিফশুলজ মশায় এই তাহের ম্যাগ্নিফাইং বাক্যটি রচনা করেছেন...............

তাই অনুসন্ধানী ভাবনায় প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন রাখলামঃ
জিয়ার জীবন কি বিপন্ন ছিলো ?
যদি বিপন্ন হয়েই থাকে তবে কার হাতে বিপন্ন হয়েছিলো ?

এই প্রশ্নের উত্তরে সেই সব ইতিহাস ঢুলীরা ঢোল ঝোলায় পুরে বাশীতে মিহি সুর তোলেঃ
খালেদ মোশাররফের হাতে.........

আসলেই কি তাই ?

৭ ই নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের ইমপালসে মুক্তি পাওয়ার পর জিয়া তার বন্দিত্বের মুল কুশলী শাফায়াত জামিলকে ফোন করে বলেছিলেনঃ
ফরগিভ অ্যান্ড ফরগেট / লেটস ইউনাইট দা আর্মি...............
জবাবে শাফায়াত জামিল রুক্ষ রূঢ় ভাবে জিয়ার সেই উদার আহ্বান ছুড়ে ফেলেন............

অথচ প্রাণ নিয়ে পালানোর সময় ভাঙ্গা পা নিয়ে অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে নারায়নগঞ্জ থানা থেকে টু ফিল্ড রেজিমেন্টে জিয়ার কাছেই তাকে উদ্ধারের জন্য ফোন করলেন শাফায়াত জামিল............
জিয়াও তাকে উদ্ধার করে এনে সিএমএইচে ভর্তি করেন............

১ / পাতা ১৪৫ – ১৪৬ /ইমেজ লিংক ১ /ইমেজ লিংক ২

যার কাছে জিয়ার এবং তার পরিবারের জীবন বিপন্ন ছিলো বলে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে তাকেই জিয়ার এমন উদারতা প্রদর্শন কেবল সাম্প্রতিক প্রচারিত ইতিহাসের সাথে বেমানানই নয় , মোটা দাগের ব্ল্যাক আউট অব ট্রুথ...............

ঠিক এই জায়গাটাতেই আলো ফেলেছেন কর্ণেল শাফায়াত জামিল নিজেইঃ

ইতিমধ্যে দুপুর দুটোর মধ্যে জিয়া তার পদত্যাগ পত্র জমা দেন। তিনি আমাকে একবার তার সাথে দেখা করার জন্য খবর পাঠান ; কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আমার জন্য সেটা হতো কিছুটা বিব্রতকর। জিয়ার সাথে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিলো । একাত্তরে এক সংগে যুদ্ধ করেছি আমরা ............তবে জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার ভার আমার উপর ছিলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম , নিজেদের ক্ষমতা সংহত করার পর জিয়াকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ি প্রতিনিধি করে পাঠিয়ে দেবো........
১ / পাতা ১৩৬ / ইমেজ লিংক

হ্যা , এটাই সত্য............
৭১ 'র যুদ্ধদিনের বন্ধু শাফায়াত জামিল তথা খালেদ মোশাররফ গং সেকেন্ড ইন কমান্ড এর হাতে জিয়ার জীবন বিপন্নই ছিলোনা...............
ছিলো প্রোটেক্টিভ কাস্টডীতে !

ছবি : চিলমারী / সেপ্টেম্বর ১৯৭১ , অপারেশন শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে জেড ফোর্স অধিনায়ক জিয়া , ডানপাশে শাফায়াত জামিল
ফুল রেসোলিউশন ইমেজ

বিষয়টা শাফায়াত জামিলের আত্নপক্ষ সমর্থন ধরে যদি স্কেপ্টিক কারো ভ্রুকুটি হয় তাহলে সে সন্দেহ দূর করতে পারেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সর্বাধিক গ্রন্থপ্রণেতা মেজর রফিকুল ইসলামঃ

জেনারেল জিয়া কখনোই চাননি খালেদকে হত্যা করা হোক , খালেদ ও জিয়াকে হত্যা করতে চান নি........জেনারেল জিয়া খালেদ কে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন , নিহত হওয়ার সংবাদে মর্মাহত হয়েছিলেন..........
২ / পাতা ৯০ / ইমেজ

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের কাছ থেকে যেটা জানা যায় টু ফিল্ড আর্টিলারি থেকে জিয়া বংগভবনে ফোন করেছিলেন মূলত খালেদের সাথেই কথা বলার জন্য............
কিন্তু জিয়া জানতেন না যে খালেদ সেখানে নেই , তাই ফোন রিসিভ করেন শাফায়াত জামিল......
এ কারনে এটাও পরিস্কার ' ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ / লেটস ইউনাইট দা আর্মি ' কথাটি জিয়া খালেদকেই বলতে চেয়েছেন............
৩ / পাতা ১০৭ / ইমেজ

সুতরাং তাহের জিয়ার জীবন রক্ষক বাক্যটি একটি খারিজ মামলা যার শেষ রায়টি দিয়েছেন স্বয়ং কর্ণেল তাহের নিজেই:

আমি সেনাবাহিনী প্রধানকে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করেছি...............
কালের কন্ঠ / ২১শে জুলাই ২০১০ / তাহেরের জবানবন্দি

তাহেরের দাবি থেকেই ঘটনার চরকা সামনের দিকে ঘোরাই..........
তাহের জিয়ার জীবন রক্ষক বাক্যটি গরল মিথ্যা হলেও তাহের জিয়ার বন্দীদশা মুক্তির নায়ক এই বাক্যটিও একেবারে সরল সত্য নয়.....

পরীক্ষন কাচের প্রতিসরনাংককে ফাকি দিতে না পারায় “জিয়ার বন্দিদশা মুক্তির নায়ক তাহের” বাক্যটুকুও বেশ বড় একটা বাক নেয়..........
পরিস্কার ধরা পড়ে সত্য বিচ্যুতি............

প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন বললাম এমনটা...............
কারন নিজ স্বার্থে জিয়াকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করা তাহের জিয়া এবং খালেদদেরকে মনে করতেন কেউটে সাপ...............
অথচ মুখে মধু মনে বিষ নিয়ে জিয়ার সাথেই টু ফিল্ড আর্টিলারিতে সবার সামনে আলিংগন করেছেন বিপ্লবের ছক্কা দিয়ে ক্ষমতার সাপলুডু খেলোয়াড় তাহের.........

জিয়াকে খালেদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে তাহের চেয়েছিলো নিজের বন্দিশালায় আটকাতে.........

৬ নং মঈনুল রোডের বাসা থেকে ধরে এনে তাহেরের বড় ভাই সার্জেন্ট আবু ইউসুফের এলিফ্যান্ট রোডের ৩৩৬ নাম্বার বাড়িতে নিয়ে এসে কব্জা করতে........

খালেদ যেমন জিয়াকে বন্দি করে জোর করে পদত্যাগ পত্রে জিয়ার স্বাক্ষর নিয়েছিলো , ঠিক তেমনি তাহেরও চেয়েছিলো হাতের মুঠোয় নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের জনপ্রিয়তম সেনাপিতা জিয়াকে দিয়ে তার স্বার্থ হাসিল করতে............
ছলেবলে কৌশলে জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে নিয়ে এসে তাহেরের খুনি খেপাটে বিপ্লবী গণবাহিনীর খাচায় পুরতে...............

কিন্তু তাহেরের ভৃত্য হাবিলদার আব্দুল হাই মজুমদার জিয়াকে রেস্কিউ করে নিজেদের কব্জায় নেয়ার আগেই টু ফিল্ড আর্টিলারির সৈনিকরা তাদের প্রিয় সেনাপিতা জেনারেল জিয়াকে টু ফিল্ড আর্টিলারি অফিসে নিয়ে আসে.........

আর তাতেই তাহের বলে বসেনঃ
তোমরা তো নিজের পায়ে কুড়াল মারলা । খেলা তো হাতের বাইরে চলে গেলো
আমাদের সময় / নভেম্বর ৬ /২০১০/ হাসানুল হক ইনুর সাক্ষাতকার/ পিডিএফ

এই আমাদের সময়ের নভেম্বর ৭ , ২০১০ এ হাসানুল হক ইনু জানিয়েছেন তাদের পরিকল্পনা কি ছিলো জিয়া এবং খালেদকে নিয়েঃ

কর্ণেল তাহের জিয়া সম্পর্কে বলেছিলেন, এরা কেউটে সাপের মত উচ্চাভিলাষি ক্ষমতালোভি অফিসার। ৬ ই নভেম্বর রাতে মেজর জিয়াউদ্দিন ঢাকায় থাকলে খেলা ঘুরিয়ে দেয়া যেতো........... সেরাতের পরিকল্পনা ছিলো এরকম............(৪) হাবিলদার হাই জিয়াকে মুক্ত করে তাহেরের কাছে নিয়ে যাবে (৫) সারোয়ার ও নায়েক সিদ্দিক খালেদকে গ্রেফতার করবে। অভ্যুত্থান রাত ১২ টার বদলে রাত ১ টায় শুরু হওয়ায় দিনটি ৭ নভেম্বর হয়ে যায়। জিয়াকে মুক্ত করলেও তাহেরের নিয়ন্ত্রনে নেয়া হয়নি.......
আমাদের সময় / নভেম্বর ৭ , ২০১০ / হাসানুল হক ইনুর সাক্ষাতকার/ পিডিএফ

তাহলে সাধারন পাঠকরাই বিচার করুন............
তাহের যা করতে চেয়েছিলো তাতে কি জিয়ার সত্যিকার বন্দিত্ব মুক্তি ঘটতো না কি বন্দি জিয়ার খাচাটাই কেবল বদল হতো ?



মঈনুল রোডের খাচার বদলে এলিফ্যান্ট রোডের খাচা !

শিরোনামের পুরোটা এখনো পরিব্যপ্ত হয়নি ব্লগে.............

কারন অনালোচিত রয়ে গেছেন নায়কোচিত অনেকেই...............
৭ ই নভেম্বরের ইতিহাসের প্রজেক্টরে যাদের কেবল ছায়াটাই পড়েছে , কায়া হয়নি স্পষ্ট............

৪ ই বেংগল রেজিমেন্ট কমান্ডিং অফিসার কর্ণেল আমিনুল হক বীরবিক্রম...........
৪ ই বেংগল রেজিমেন্ট অ্যাডজুটেন্ট মেজর মুনীর.........
২ ফিল্ড আর্টিলারীর সুবেদার মেজর আনিস প্রমুখ.........

এ পর্যায়ে এসে ফেলে আসা প্রশ্নটি আবারো তুলতে হচ্ছেঃ
জিয়ার জীবন কি বিপন্ন ছিলো ?

ভেতরে জিয়াকে নিয়ে কুট চাল মার খাওয়ার ঘায়ে আহত আর ক্ষমতার খেলায় ক্রেইজী হয়ে ওঠা তাহেরের হাতেই জিয়ার জীবন বিপন্ন হয়েছিলো........
এ যেন অনেকটা খালেদের তপ্ত কড়াই থেকে তাহেরের জ্বলন্ত উনুনে পড়েছিলেন জিয়া.......
৭ থেকে ১১ নভেম্বরের সেই শংকুল সময়ে দফায় দফায় জিয়ার বিপন্ন জীবন রক্ষা করে ছিলেন কর্ণেল আমিন , মেজর মুনীর , সুবেদার মেজর আনিসরা তার চারপাশে ডিফেন্স পেরিমিটার তৈরী করে......

বিপদের শুরুটা হয় ৭ ই নভেম্বর দিবাগত রাত ২-৩০ থেকে যখন তাহের জিয়াকে রেডিও স্টেশনে নিতে জোরাজুরি করেন.........
এ সময় জিয়ার মনস্তত্ব দোলাচলে ছিলো , পুরো আধঘন্টা ধরে তাহের জিয়ার সাথে ২ ফিল্ড আর্টিলারী অফিসের বাথরুমের প্যাসেজে বসে উত্তেজিত স্বরে কথা বলছিলো এবং একপর্যায়ে
তাহের সেখানে উপস্থিত কর্ণেল আমিনুল হক , মেজর মুনীর , সুবেদার মেজর আনিসদের সাথে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে..........

সেসময় টিকে বর্ণনা করেছেন মেজর জেনারেল মঈনুল হোসেন বীরবীক্রমঃ
এসেই তিনি জিয়াকে রেডিও স্টেশনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আমরা জিয়াকে রেডিও স্টেশনে যেতে বারন করি । এ সময় লেঃ কর্ণেল আমিনুল হক এবং তাহেরের সঙ্গে ঝগড়া বেধে যায়। এক পর্যায়ে আমিনুল হক তাহেরকে বলে বসেন আপনারাতো (জাসদ) ভারতের বি টিম। ফলে তাহের রাগান্বিত হয়ে সেখান থেকে চলে যান.........৪ / পাতা ৯৩ / ইমেজ

মুলত কর্ণেল আমিনুল হকই সেদিন রাতে জিয়াকে যাতে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সুরক্ষিত রাখা যায় সেটা নিয়ে সজাগ ছিলেন............
জিয়া-তাহের লম্বা আলোচনা চলার সময় কর্ণেল আমিন ব্রিগেডিয়ার মীর শওকতকে ডেকে নিয়ে যান আলাদা ভাবে এবং তাকে বলেন জিয়া যেন রেডিও স্টেশনে যেতে তাহেরের মিষ্টি কথার দুষ্ট অনুরোধ না গেলে............

মীর শওকত জিয়াকে তাহেরের সাথে আলাপ চলার মাঝেই ডেকে নিয়ে সাবধান করেন কর্ণেল আমিনের আশংকা মোতাবেক এবং সবার সামনেই বলেনঃ

জিয়া তুমি জাসদের সাথে যাবেনা [ইনুর ভাষ্য মত]............
জিয়া হেড কোয়াটারের বাইরে গেলে আমাদের জীবনের ঝুকি আছে........
তাহের এ সময় মীর শওকতকে বলেনঃ শাট আপ [ইনুর ভাষ্যমত].........
জবাবে মীর শওকত বলেনঃ ইউ গেট লস্ট...........
মীর শওকত আরো বলেনঃ আমিনুল হকের বুদ্ধিমত্তায় সেদিন জিয়া বেচে যান.........
আমাদের সময় / নভেম্বর ৪ , ২০১০ / মীর শওকত এর সাক্ষাতকার / পিডিএফ

আমাদের সময়ের নভেম্বর ৬ , ২০১০ এর সাক্ষাতকারে ইনু একটি জ্বলজ্বলে সত্য চেপে গিয়েছেন........
ইনুর ভাষ্যমতে তাহের জিয়াকে বলেছিলেন ৭ নভেম্বর সকাল ১০ টায় সোহরাওয়ার্দি ময়দানে সৈনিক জনতার জনসভা হবে , সেখানে জিয়া ভাষন দেবেন , এখন কিছু বলার দরকার নাই ।

কিন্তু যে সত্যটি চেপে গিয়েছেন ইনু সেটি হলঃ
জিয়া যখন রাজী হননি জনসভায় যেতে তখন তাহের নতুন চাল চালেন জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে নিয়ে আসার জন্য.........
সেটি হল রেডিও স্টেশনে ভাষন দেয়ার অজুহাতে জিয়াকে কব্জা করা কারন রেডিও স্টেশন তাহেরের বিপ্লবি গণবাহিনীর দখলে ছিল আগে থেকেই.........


কেবল মইনুল , রফিক , হামিদ আর মীর শওকতের বক্তব্যেই নয়.......
৭ ই নভেম্বর বেলা ২টায় তাহের তার প্রতিবেশী মিটিদের এলিফ্যান্ট রোড ৩৪৬ নং বাসা থেকে যেভাবে টেপ রেকর্ডারের স্পুলে ভাষন রেকর্ড করে দৌড়ঝাপ করছিলেন তাতে সেটা স্পষ্ট.......... তাহেরের প্রতিবেশি নাজমুল আহসানের বক্তব্য

ঘটনাটির আরও বিস্তারিত জানিয়েছেন কর্ণেল এম এ হামিদঃ
তাহের জিয়াকে টু ফিল্ড থেকে বের করে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যেতে চাইছিলো। রেডিও স্টেশনে তার লোকজন উপস্থিত ছিলো.........উপস্থিত কর্ণেল আমিন , মুনির , সুবেদার মেজর আনিস তারা জিয়ার পাশে থেকে বলেন রেডিওতে ভাষন দিতে হলে রেকর্ডিং যন্ত্র এখানে আনা হবে। তাকে এখন বাইরে যেতে দেয়া যাবেনা । ভেস্তে যায় তাহেরের প্ল্যান.........

সুবেদার মেজর আনিস কর্ণেল তাহেরকে বললেন , আপনি এখন দয়া করে আসুন। তাহের কটমট করে তার দিকে তাকালো । বলল , আমাকে চেনেন ? আনিস বললো জ্বি স্যার আপনাকে চিনি , তবে আপনি এখন আমার সাথে আসুন।

এভাবেই ব্যর্থ হয় তাহেরের ২য় দফা জিয়াকে ইনুর ভাষায় নিয়ন্ত্রনে নেয়ার চেষ্টা যেটি ছিলো আসলে জিয়াকে ২য় বার বন্দী করার কুটিল পরিকল্পনা ।

ভাবতেই অবাক লাগে ২০১০ সমসাময়িক গণমাধ্যম তাহেরকে কিভাবে মাহাত্ব্য দিয়েছে !
তাহের টু ফিল্ডে জনপ্রিয় জিয়াকে নিজস্বার্থে বলছিলেন “ আপনি সেনাপতি , আসুন ,জাতি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে “ , আর ইনুকে এলিফ্যান্ট রোডে বলছিলেন জিয়া খালেদ এরা কেউটে সাপ !

সুস্পষ্টভাবে মুখে মধু আর মনে বিষ......
অথচ আয়নায় তাকালে তাহের নিজের ভেতরেই একটা জ্বলজ্ব্যান্ত মোনাফেক কেউটে দেখতে পেতো............

যাইহোক ২ ফিল্ডে বসেই জিয়ার ভাষন রেকর্ড করা হলো । আর সেখানেই তাহেরের খেলার ৩য় দফা ' হান্ট জিয়া মিশন ' শুরু হয় যেটিকে কর্ণেল হামিদ বলেছেনঃ

সুবেদার মেজর আনিস বললো আমাদের উপস্থিত সবাইকে ছেড়ে তাহেরের সাথে জিয়া সাহেবের এত লম্বা গরম আলোচনা দেখে আমার নিজেরই মাথা গুলিয়ে যায়...............সাধারন সৈনিকদের ধারনা ছিল জিয়াকে মুক্ত করার পরই সেপাই বিদ্রোহ শেষ হয়ে যাবে...........
৫ / পাতা ১০৫ – ১০৬/ পিডিএফ

৭ই নভেম্বর সকাল বেলা থেকে শুরু করছি............
ইতোমধ্যে রেডিওতে প্রচারিত হয় জিয়ার জাতি উদ্দীপক ভাষন............
নিউইয়র্ক টাইমস / নভেম্বর ৭ , ১৯৭৫/ উইলিয়াম বর্ডারের প্রতিবেদন /ইমেজ লিংক ১ / ইমেজ লিংক ২
সকাল ৮ টার দিকে তাহের আসেন টু ফিল্ড আর্টিলারীতে..........
৩ বাহিনী চিফ , জেনারেল ওসমানি, মেঃ জেঃ খলিলুর রহমান এবং তাহের সহ সবাই মিটিং এ বসেন কে হবেন প্রেসিডেন্ট , কে হবেন সি এম এল এ তা ঠিক করতে............
ওসমানি চেয়েছিলেন খোন্দকার মোশতাক কে প্রেসিডেন্ট রাখতে........
জিয়া চেয়েছিলেন নিজে সি এম এল এ হতে.........
কিন্তু মেঃ জেঃ খলিল এবং তাহেরের আপত্তির কারনে দুটোর কোনটাই হয়নি.......
সিদ্ধান্ত হয় সায়েমই হবেন প্রেসিডেন্ট এবং সি এম এল এ , আর ৩ বাহিনী চিফ হবেন ডেপুটি সি এম এল এ.......
৮ই নভেম্বর , ১৯৭৫ / নিউইয়র্ক টাইমস / ইমেজ লিংক

এতদুর পর্যন্ত তাহের শান্ত রূপে ছিলেন.........
কিন্তু সেই মিটিং এ তাহেরের ১২ দফা কারো সমর্থন পেলোনা.........
তারই রেশ ধরে আসল রূপে দেখা দিলেন তাহের ৭ই নভেম্বর বিকাল থেকে............
সেদিন বিকাল ৪ টায় তাহেরের সাথে টু ফিল্ডে দেখাহয় কর্নেল হামিদের............
তাহেরের গম্ভীর চেহারা দেখে হামিদ জানতে চান কি হয়েছে , জবাবে তাহের জানান জিয়ার কথা না রাখায় অসন্তোষ............

এসময় হামিদ কর্নেল আমিনের কাছ থেকে জানতে পারেন কাল রাতে যেসব সেনাদের ইউনিফর্ম গায়ে চাপানো , কিন্তু হাবেভাবে সেনা নয় লোকজনকে হামিদ দেখেছেন এরা স্রেফ তাহেরের গণবাহিনীর বিপ্লবি..................
অশনি টের পেয়ে হামিদ আমিনুল হককে বলেন ৪ই বেঙ্গল কে দিয়ে জিয়ার চারপাশে ডিফেন্স পেরিমিটার তৈরি করতে............
তারই প্রমান পাওয়া যায় ৭ ই নভেম্বর সন্ধায় যখন জিয়া রেডিও স্টেশনে যান ৪ই বেংগলের সেনা পরিবেষ্টিত হয়ে...........
সেখানেই জিয়াকে তাহেরের লোকজন চেপে ধরে ১২ দফার জন্য............
জিয়া ঠেলায় পড়ে দাবিনামা স্বাক্ষরও করেন , কিন্তু রেডিও ভাষনে জিয়া ১২ দফা কিছু বলেননি............



তখন থেকেই ৭ ই নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লব খুনের রক্তে কলুষিত হয় তাহেরের প্ররোচনায়............
তাহের বন্ধুত্বের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে জিয়াকে ছোবল দিতে ফণা তোলেন.........
৭ ই নভেম্বর সকালে ক্যান্টনমেন্টে যে পরিবেশ বিদ্যমান ছিল বিকালে তা সম্পুর্ন ভিন্ন আকার ধারন করলো । অফিসাররা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লো । তারা ধীরেধীরে সরে পড়তে লাগল । মনে হল যে কোন মুহুর্তে তাহেরের জিয়া উতখাত প্ল্যান শুরু হয়ে যেতে পারে............কর্নেল হামিদ , ৫ / পাতা ১১৫

সন্ধ্যা থেকে অফিসাররা রিকশা করে, গাড়িতে করে যার যার পরিবারকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছিলো............
বিডিআর বিদ্রোহের মতই অবিকল একই রক্তহিম করা মৃত্যু আতঙ্কের ৩৮ ঘণ্টা কাটিয়েছেন নিরপরাধ সেনা অফিসাররা............
সন্ধ্যার মধ্যেই COD ভেঙ্গে পুরো ক্যান্টনমেন্ট অস্ত্রে অস্ত্রে সয়লাব , তবে সবার হাতে সে অস্ত্র পৌঁছায়নি............
অফিসাররা নিরস্ত্র , তাহেরের খ্যাপাটে বিপ্লবিরা সশস্ত্র...............কর্নেল হামিদ নিজেই খুনের নেশায় পাগল হওয়া সেপাইদের বন্দুকের মুখে পড়েছিলেন, বাঁচিয়েছিল তার ব্যাটম্যান সমুজ আলি আর আরো ৪ জন অনুগত সেপাই...............
সেরাতে বেঘোরে প্রান হারালেন ডেন্টাল সার্জন মেজর করিম, মিসেস মুজিব, মিসেস ওসমান [সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরীর স্ত্রী] , মেজর আজিম.........

জিয়াউর রহমান তখন অসীম সাহসের সাথে নিরস্ত্র অবস্থায় সশস্ত্র সৈনিকদের প্রতিশ্রুতি দেন তাদের ১২ দফার ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেয়ার.........
অনেক সৈনিক তখন অস্ত্র জমা দেয়ার ওয়াদা করে যারা তাহেরের বিপ্লবি সৈনিক সংস্থার সাথে জড়িত ছিলোনা
সেটির একটি ধারনা পাওয়া যায় ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াতের কাছেঃ
৩ /পাতা ১১৪ / ইমেজ.........
৩ /পাতা ১১৫ / ইমেজ.........

কর্নেল হামিদের কাছেও একই বিবরণ পাওয়া যায়ঃ
আমি জিয়াকে খুজছিলাম। সে তখন পাগলের মত এখানে ওখানে ঘুরছিল।.........জিয়া বলল আগে তোমরা অস্ত্র জমা দাও , আমি সব দাবি মানবো......তাহেরের ইঙ্গিতে বিপ্লবিরা একেবারেই উল্টে গেছে । বিপ্লবিরা জিয়াকেও হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে ।

সেসময় জিয়ার তুলনা বিরল সাহস আর ঘটনার সত্যতা যাচাই করুন ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত এবং কর্নেল হামিদের ভেতরেঃ
৫/ পাতা ১২২ :
ফুল রেসোলিউশন ইমেজ.........
তাহেরের বাধ্য আর জিয়ার অবাধ্য বিপ্লবি সৈনিকরা সেদিন সন্ধ্যায় অর্ডিন্যান্স মেসে বিনাকারনে ৩ জন তরুণ অফিসারকে মেরে ফেলে.........
এদের মধ্যে ছিল মেজর মহিউদ্দিন যে টুঙ্গি পাড়ায় বংগবন্ধুর লাশ দাফন করেছিলো.........
অন্য ২ জন হলেন ক্যাপ্টেন খালেক এবং লেঃ সিকান্দার............
হকি খেলতে এসে ক্যাপ্টেন আনোয়ার এবং লেফটেন্যান্ট মুস্তাফিজ সেপাইদের গুলিতে মারা যান স্টেডিয়ামের পাশে......
অর্ডিন্যান্স স্টেটে ১০ জন নিরপরাধ অফিসারকে লাইন আপ করা হয় মারার জন্য.........
১ জনকে মারার পর বাকিরা অনুনয় বিনয় করলে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়............
লেডি ডক্টর হামিদাকে বিনাকারনে মেরে ফেলা হয়.........
মেডিকেল কোরের ব্রিগেডিয়ার খুরশিদকে চোখ বেঁধে মাত্র গুলি করবে এমন সময় উর্ধশ্বাসে দৌড়ে পালান তিনি......
কর্নেল হামিদের নিচতলার বাসিন্দা সিগনাল রেজিমেন্টের কর্নেল শামসের বাসায় অকথ্য গালাগালি করতে করতে দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে তাহেরের আদেশপ্রাপ্ত বিপ্লবিরা , কর্নেল শামস পরিবার সহ পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান......
বিপ্লবিরা ক্ষোভে খালি বাসাতেই গুলি করে ঝাঁঝরা করে ফেলে.....
মেজর নাসির আর লেঃ কঃ গাফফার ৪ই বেংগলে এসে লুকান.......
ল্যান্সারের খুনে সেপাইদের হাত থেকে তাদের বাচান কর্নেল আমিন আর মেজর মুনির......

১২ জন অফিসার মারা পড়লেন ঐ রাতে............বিপ্লবি সৈনিকরা সত্যি সত্যিই অফিসারদের রক্ত নেশায় পাগল হয়ে উঠলো............ভাগ্যিস অধিকাংশ অফিসার ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে সন্ধ্যার আগেই শহরে তাদের নাগালের বাইরে চলে যান............ ভোর হতে না হতেই সারা ক্যান্টনমেন্টে অফিসারদের ভেতরে গভীর আতঙ্কের ছায়া............যে যেদিকে পারছে শহরে ছুটে পালাচ্ছে আশ্রয়ের খোঁজে.........ঐদিন সকাল ৮ টায় সময়ও কয়েকজন অফিসারের উপর গুলিবর্ষন করা হল............অরাজকতার মধ্যে কে কাকে ধরছে, মারছে, লাঞ্চিত করছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা...............মহান সেপাই বিপ্লব ৮ নভেম্বর সম্পুর্ন ভিন্ন আকার ধারন করল.........অফিসার দেখলেই সেপাইরা তাড়া করছে.........অফিসে আমার সুবেদার সাহেব বল্লেনঃ স্যার , আপনাকে আমরা সবাই শ্রদ্ধা করি , কিন্তু দয়া করে অফিসের বাইরে গেলে কাঁধে আপনার কর্নেলের র‍্যাংক নামিয়ে যাবেন । চারদিকে মহাবিপদ । সব অফিসাররা তাই করছে.........
কর্নেল হামিদের বর্ননা থেকে ৫ / পাতা ১২১ .........

প্রাসঙ্গিক ভাবে জানাতে হয় সেদিন জিয়ার শ্যালক সাঈদ ইস্কান্দারও ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালান......
হামিদের স্টাফ অফিসার মেজর আলাউদ্দিনকে তারই অধিনস্থ হাবিলদার সিদ্দিক বোরখা পরিয়ে ক্যান্টনমেন্ট পার করে দেয়.........
হামিদ নিজেও একজন অফিসারের সাথে রাস্তায় কথা বলেন যে বোরখা পরে পালিয়ে যাচ্ছিল......
বনানিতে আরেকজন সিনিয়র গোয়েন্দা অফিসার শাড়ি পরে পালানোর সময় সেপাইদের হাতে ধরা পরে যাকে নিয়ে ঐ সেপাইদের হাসি থামছিলোনা.......

সে রূদ্ধশ্বাস সময়টুকুতে জিয়া কি করেছিলো , তাহের কি করতে চেয়েছিল আর প্রানভীত নিরপরাধ অফিসারদের নাইট মেয়ার তুল্য অভিজ্ঞতার পুরোটা উঠে আসে হামিদের বইয়ের পাতা ১১৩-১২৫ এ......পিডিএফ

ইনু আমাদের সময়ে তার সাক্ষাতকারে বলেছেন বিপ্লবি সেনাদের হাতে অফিসারদের মৃত্যু বিচ্ছিন্ন ঘটনা.........
কর্ণেল হামিদের কাছ থেকে এরই মধ্যে জেনেছেন জিয়া আর অফিসারদের বিরুদ্ধে তাহেরের জিঘাংসা আর বিদ্বেষপূর্ণ লিফলেট ছড়ানোর খবর....

এ বিষয়ে মেজর রফিক কি বলেছেন দেখুন:
৯ই নভেম্বর জিয়া গ্যারিসন সিনেমা হলে সমবেত সৈনিকদের উদ্দেশ্যে এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় বলেন যে , কোন অফিসারকে হত্যা করার আগে তাকে প্রথমে হত্যা করতে হবে......

পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন জিয়া জাসদের রব জলিলদের কে ৮ তারিখে মুক্তি দিয়েছিল , অথচ এরাই সৈনিকদের অস্ত্র জমা দিতে নিষেধ করে....
সুতরাং ৭ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে ৮ তারিখ রাত পর্যন্ত অফিসার খুনের প্ররোচনা কে দিয়েছিল আর সেসব খুনের দায়ভার কার উপর বর্তায় সেটা নিজ দায়িত্বে বুঝে নিন.........
যদি তাও বুঝতে অসুবিধা হয় তো ২৫ ফেব্রুয়ারি / ২০০৯ পিলখানা হত্যাকান্ডের স্মৃতিচারন করুন......

তাহের , ইনু , রব , জলিলরা স্রেফ ডিএডি তৌহিদ , সুবেদার গোফরান , কোয়াটার গার্ড শাহজাহান মাতব্বরদের দর্পন বিম্ব / মিরর ইমেজ......
তাহলে কি ভবিষ্যতের দিনগুলোতে তৌহিদও বিপ্লবির মর্তবা পাবে কোন এক মতলববাজ মিডিয়ায় ?
আগস্ট ২৭ , ২০১০ / ইত্তেফাকে লুতফা তাহের বলেছেনঃ জিয়া যে এত নিষ্ঠুর ছিল তা জানতাম না............
কিন্তু লুতফা তাহের , জিয়াও জানতো না যে ক্রাচে ভর দিয়ে একজন মানুষ এত বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে............

সেদিন রাতের সেই রক্তারক্তি বিভীষিকার স্মৃতি যেসব সেনা অফিসার আর তাদের পরিবারের মাঝে বেঁচে আছে তারা কোনদিনও আপনার স্বামির সদ্যলদ্ধ মাহাত্ন্যকে পরোয়া করবেনা.........

বিপ্লবের মোড়ক প্যাঁচানো ক্ষমতার আফিমে নেশাগ্রস্ত হওয়া তাহেরের প্রতি সেসব পরিবার যতটুকু মাত্রার শাস্তি চেয়েছিল জিয়া কেবল তার আজ্ঞাবাহকই ছিল..................

প্রমান চান ?
তাহলে দেখুন সেক্টর কমান্ডার আবু ওসমান চৌধুরী কি বলেছেন ৭ নভেম্বর / ২০১০ তারিখে প্রথম আলোতেঃ
ওইদিন জওয়ানদের বলা হয়েছিলো সব অফিসারদের হত্যা করো । থাকবে শুধু জিয়া আর তাহের । একারনে জওয়ানেরা অফিসারদের হত্যা শুরু করে । অনেক অফিসার সেদিন বোরখা পরে পালিয়ে গিয়েছিলেন............
৭ নভেম্বর , ২০১০ / প্রথম আলো / ইমেজ লিংক
অবিকল কর্নেল হামিদের প্রতিধ্বনি , কারন এটাই যে তাহের ভক্তদের জন্য শ্রুতিবিষ কিন্তু অমোচনীয় সত্য

ইনু নিজেই নভেম্বর ৭ / ২০১০ আমাদের সময়ে দেয়া সাক্ষাতকারে স্বীকার করেছেন যে জিয়া একা তাহের এবং তার সহযোগীদের বিচার চূড়ান্ত করেননিঃ

৭৬ সালের জুলাইয়ে সামরিক আদালতে ট্রায়াল শুরু হলে জিয়া একদিন মিলিটারি ফরমেশন কমান্ডারদের বৈঠক ডাকলেন । বৈঠকে মতামত এলো জলিল , রব , ইউসুফ , জিয়াউদ্দিন , ইনু ও তাহের বিপদজনক লোক । এদের ফাঁসিতে ঝুলানো যায়......এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত এলো তাহেরের ফাঁসি , জলিলের যাবজ্জীবন , বাকিদের ১২ বছর করে কারাদণ্ড.......

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের মতে এই মিটিং এ মোট ৪৯ জন সেনা অফিসার অংশ গ্রহণ করেন এবং সে সময়কার অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মঈনুল হোসেন বীরবিক্রম জানান তিনিই জিয়াকে ৭/৮ নভেম্বরের খুনোখুনির বিচারের ব্যবস্থা নিতে বলেন.........৪ / পাতা ৯৭ / ইমেজ

মুলত সামরিক আদালতের বিচারে নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করলে অনুকম্পা বা লঘু শাস্তির একটি সুযোগ থাকে যেটি হালে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের অনেক অভিযুক্তও পাচ্ছেন.........
সে সুযোগ তাহেরের ও ছিলো..........
কিন্তু তাহের সে সুযোগ নেবেনা বলে একরোখা আচরণ করে যেটি মীর শওকত জানিয়েছেন আমাদের সময়কে নভেম্বর ৫ / ২০১০ তারিখেঃ

জিয়া বলেনঃ তাহের তো মার্সি পিটিশন দেয়নি.........
বিষয়টি নিশ্চিত করেন স্বয়ং লুৎফা তাহের : দৈনিক ইত্তেফাক / আগস্ট ২৭ , ২০১০/ পিডিএফ
এভাবেই ৭ / ৮ ই নভেম্বরের “আলটেরিয়র” গুলো ধামাচাপা পড়ে গেছে বাম মিডিয়ায় প্রচার ভেল্কিতে...........
কিন্তু সত্য তার প্রমান রেখে যায়.........
জীবিত তাহের কেবল জিয়ার মৃত্যুই নয় , বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মৃত্যুও ঘটাতো........
এমনটাই বলেছেন ব্রি: সাখাওয়াত , মে: জে: আমিনরা..........

যাইহোক ব্লগটি শেষ করার আগে ২ টি প্রশ্নের আপেক্ষিকতায় পাঠকদেরকে রেখে যেতে চাই.........

[১] কর্নেল তাহেরের ১২ দফার বেশ কয়েকটি জিয়াউর রহমান মেনে নিয়েছিলেন। ব্যাটম্যান প্রথা বাতিল করেছিলেন , সৈনিকদের বেতন ভাতা-সুবিধাদি বাড়িয়েছিলেন , জাসদের রাজবন্দীদেরকে ৮ ই নভেম্বর মুক্তি দিয়েছিলেন.........
কিন্তু যেটি মেনে নেননি তাহেরের খ্যাপাটে বিপ্লবিদের বন্দুকের মুখেও সেটি হলঃ

বিপ্লবি সৈনিক সংস্থা সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারনি সংস্থা হিসেবে কাজ করবে , মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সশস্ত্র বাহিনী সংক্রান্ত যেকোন সিদ্ধান্ত এই সংস্থার সাথে আলোচনা করে গ্রহণ করবেন...............
কর্নেল তাহেরের ১২ দফা , ২ / পাতা ৯৫ – ৯৬ / পিডিএফ
প্রশ্নটা হলঃ
জিয়ার জায়গায় যদি আপনি থাকতেন আপনি কি এই দাবি মেনে নিতেন ?

[২] কর্নেল তাহের নভেম্বর ২৪ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের হাউস টিউটরের বাসা থেকে গ্রেফতার হবার পর তাহেরের ২ ভাই নভেম্বর ২৬ তারিখে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেনকে অপহরণের চেষ্টা চালায় এবং দুতাবাসের নিরাপত্তা রক্ষিদের গুলিতে ৪ জন মারা যায়

আমার প্রশ্নটা হলঃ
কেন বেলাল আর বাহার সমর সেনকে ই অপহরণ করতে চাইলো ?
অনেকেই হয়ত ধরে ফেলেছেন আমি কি বলতে চাইছি......
যারা ধরতে পারেননি তাদের জন্য সম্পূরক প্রশ্ন রাখছিঃ
তাহেরের মুক্তির জন্য পণ হিসেবে ভারত ভিন্ন অন্য কোন দেশের রাষ্ট্রদুতকে কে বাহার – বেলাল টার্গেট করলো না কেন ?

উত্তরটা খালি চোখেই বোঝা যায় – তাহেরের ভাইরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকেই মুলত ভাই এর মুক্তির জন্য পন হিসেবে নিয়েছিল.........

সমর সেনকে যদি অপহরণ করা হতো , এবং তার সুত্র ধরে যদি কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড বাংলাদেশে অভিযান চালাত - পরপর ২ টি ক্যুতে বেসামাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনি সে ধকল নিতে পারতোনা............
আর এই হুজ্জত হাঙ্গামার ডামাডোলে গণবাহিনীর স্বশস্ত্র বিপ্লবিদের দ্বারা জেলমুক্তি ঘটত তাহেরের...........

তেমনটাই টের পাওয়া যায় মার্কিন বিশ্বসংবাদ সাময়িকী ফ্যাক্টস অন ফাইলের ডিসেম্বর ৬ / ১৯৭৫ সংখ্যায় /ইমেজ
তারও আগেরটা বুঝে নিতে পারেন ফ্যাক্টস অন ফাইলের নভেম্বর ২৯ / ১৯৭৫ সংখ্যায় / ইমেজ

তাহেরের বেপরোয়া নেতৃত্বে ঢাকায় ১২ জন সহ সারাদেশে ৪০ জন সেনা অফিসার নিহত হওয়াই বিপদের শেষ নয় , ওয়াশিংটন পোস্ট নভেম্বর ১৫ / ১৯৭৫ এর খবর অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশ সেনাবাহিনির এ ত্রাহি সময়ে বর্ডার আউটপোস্ট গুলোতে আক্রমন চালাচ্ছিলো যেটি ভারত ১৭ নভেম্বর অস্বীকার করে....

তাহলে পাঠকরাই বলুন........
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে যারা ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের নেতা মুক্তির স্বার্থে তাদের মুখে কি 'স্বদেশ দীর্ঘজীবি হোক' স্লোগান মানায়?

0 মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি



ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ নামের একটি নির্বাচনী পদ্ধতি। তবে এ পদ্ধতিকে কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করা হয় না বা এর কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোও নেই।

দেশের সর্বাধিনায়ক নির্বাচনের ক্ষেত্রে কংগ্রেস এবং সাধারণ জনগণের রায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াসের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতিষ্ঠাতা পিতারা এই পদ্ধতিকে সংবিধানে অঙ্গীভূত করেছিলেন আজ থেকে প্রায় দু’শ বছর আগে।

ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে একজনকে বেছে নেওয়ার জন্য ‘ইলেক্টর’ বা নির্বাচক মনোনয়নের একটি প্রক্রিয়া। ইলেক্টর নামে অভিহিত এই মনোনীত নির্বাচকরাই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট বেছে নিতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। আর সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় মার্কিন আইন পরিষদ কংগ্রেসে।

ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রে মোট নির্বাচক বা ইলেক্টরের সংখ্যা ৫৩৮ জন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে একজন প্রার্থীকে কমপক্ষে ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট নিশ্চিত করতে হবে।

কংগ্রেসে কোনো রাজ্যের তরফে থাকা প্রতিনিধির অনুপাতে নির্ধারিত হয় ওই রাজ্যের মোট ইলেক্টরের সংখ্যা। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেসেন্টিটিভে কোনো রাজ্যের প্রেরিত প্রত্যেক প্রতিনিধির বিপরীতে একজন করে ইলেক্টর মনোনীত হন। এছাড়া প্রত্যেক সিনেট সদস্যের বিপরীতেও একজন করে ইলেক্টর মনোনীত হয়ে থাকেন। অবশ্য মার্কিন সিনেটে প্রত্যেক রাজ্যের জন্য দুটি সিনেট সদস্য পদ সংরক্ষিত থাকে। এক্ষেত্রে জনসংখ্যা ও আয়তন বিবেচনায় নেওয়া হয়না।

তবে মার্কিন সংবিধানের ২৩ তম সংশোধনী অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্য ছাড়াও ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার জন্য ৩ জন অতিরিক্ত ইলেক্টর বা নির্বাচকের সুযোগ রাখা হয়েছে। ইলেক্টোরাল কলেজ পদ্ধতির স্বার্থে এজন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়াকেও একটি রাজ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রত্যেক প্রার্থী নিজের অথবা তার দলের পছন্দ অনুযায়ী ইলেক্টরের মনোনয়ন দিতে পারবেন। তবে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত ইলেক্টরে মনোনয়ন দিয়ে থাকে।

তবে একজন ব্যক্তির ইলেক্টর হিসেবে মনোনয়ন লাভের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা সম্পর্কে প্রত্যেক রাজ্যেরই নিজস্ব কিছু অবশ্য পালনীয় বিধি বিধান আছে।

প্রথা অনুযায়ী প্রতি চারবছর শেষে নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

একজন ভোটার নিজের পছন্দের প্রেসিডেন্টের জন্য ভোট দেওয়ার সময় একই সঙ্গে ইলেক্টোরাল প্রতিনিধির জন্যও ভোট দেন। আসলে ভোটাররা ইলেক্টর নির্বাচনের জন্যই ভোট দেন, কারণ কাগজে কলমে এই ইলেক্টরদের ভোটেই নির্বাচিত হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট।

বেশিরভাগ রাজ্যেই অবশ্য ‘বিজয়ীই সব পাবে’ এই নীতিতে ওই রাজ্যের ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট বণ্টিত হয়। অর্থাৎ একটি রাজ্যে সর্বাধিক ভোট প্রাপ্ত রাজনৈতিক দলই ওই রাজ্যের জন্য বরাদ্দ করা সব ইলেক্টোরাল ভোট আপনাআপনি লাভ করবে। তবে মেইন ও নেব্রাস্কা রাজ্যে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। সেখানে রাজ্যের জন্য বরাদ্দকৃত ইলোক্টারাল ভোট ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ পদ্ধতি অনুযায়ী ভাগ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে রাজ্যে সর্বাধিক ভোট প্রাপ্ত রাজনৈতিক দল পায় দুটি ইলেক্টর ভোট আবার প্রত্যেক কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে বিজয়ী রাজনৈতিক দল পায় একটি করে ইলেক্টর ভোট।

প্রেসিডেন্সিয়াল ভোট শেষ হওয়ার পর প্রত্যেক রাজ্যের গভর্নর একটি করে ‘সার্টিফিকেট অব অ্যাসারটেইনমেন্ট’ বা নির্বাচক নির্ধারণের সনদ প্রস্তুত করেন। এতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নাম এবং তাদের প্রতিনিধি ইলেক্টরদের নামের তালিকাও থাকে। এছাড়া থাকে ওই রাজ্যে প্রার্থীদের পাওয়া ভোটের তালিকাও।

এই সনদ কংগ্রেস এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাফেজখানা ‘ন্যাশনাল আরকাইভসে’ প্রেরণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক রেকর্ড রাখাই এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।

নির্বাচনের ভোটগ্রহণের শেষে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় বুধবার পরবর্তী প্রথম সোমবার অনুষ্ঠিত হয় ইলেক্টরদের বৈঠক। নিজ নিজ রাজ্যে বৈঠকে মিলিত হয়ে ইলেক্টররা নিজের পছন্দের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে আলাদা আলাদা ব্যালটে ভোট দেন।

রাজ্যের ইলেক্টরদের ভোট ‘সার্টিফিকেট অব ভোট’ হিসেবে পরিগণিত ও তালিকাবদ্ধ হয়। প্রত্যেক রাজ্যের ‘সার্টিফিকেট অব ভোট’ পরবর্তীতে কংগ্রেসে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আরকাইভ বা জাতীয় মহাফেজখানায় পাঠানো হয়।

জানুয়ারির ছয় তারিখে কংগ্রেসের একটি যৌথ অধিবেশনে এই ইলেক্টোরাল ভোট গণনা করা হয়। মার্কিন কংগ্রেসনাল হাউজ এবং সিনেটের সদস্যরা হাউজ চেম্বারে বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়ে ইলোক্টারাল ভোটের ফলাফলের একটি আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রনয়ণ করেন।

সিনেটের সভাপতি ভোট গণনা অনুষ্ঠান তদারকি করে এবং ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন। এর পর সিনেটের সভাপতি চূড়ান্তভাবে নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করেন। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জানুয়ারির ২০ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব দি ফেডারেল রেজিস্টার’ মূলত এই ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি তদারক করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস বা জাতীয় মহাফেজখানা, রাজ্য কর্র্তৃপক্ষ, কংগ্রেস এবং দেশের সাধারণ জনগণের পক্ষে তারা এ প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করে থাকে।
 

BANGLADESHI UPDATE NEWS Copyright © 2011 - |- Template created by O Pregador - |- Powered by Blogger Templates